উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রদিয়াল্লাহু আনহা এর জীবনী ৬ষ্ঠ পর্ব | Mother of the believers


হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রদিয়াল্লাহু আনহা  

[১]


ওয়ারাকা খাদিজার কথা শুনে বলে উঠলেন, 'খাদিজা, বোন আমার। তুমি যা বলছ তা যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে মুহাম্মদই এ যুগের নবি। আমি বিশ্বাস করি, এই সেই সময়, যখন নবির আগমন অবশ্যম্ভাবী। সময় সমাগত, এখন কেবল অপেক্ষার পালা। সবকিছুই মুহাম্মদের নবি হওয়ার সাক্ষ্য দিচ্ছিল। সব নিদর্শন খাদিজার অনুকূলে। কিন্তু খাদিজা কী করবেন এখন? যদি সত্যিকার অর্থেই মুহাম্মদ নবি হওয়ার যোগ্য ব্যক্তি হন, তাহলে খাদিজা কীভাবে মুহাম্মদের সঙ্গে নিজেকে জড়াবেন? এমন প্রশ্ন এবার বাসা বাধল খাদিজার মনে।


মুহাম্মদের পণ্য বিকিকিনি শেষ হলো একসময়। তিনি সব হিসাব বুঝিয়ে দিতে এলেন খাদিজার কাছে। অন্যান্যবার যে পরিমাণ মুনাফা হয়, এবার তার চেয়ে দ্বিগুণ মুনাফা হয়েছে খাদিজার আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায়। কিন্তু ব্যবসার মুনাফার দিকে খাদিজার তাকিয়ে দেখার আগ্রহ নেই। তিনি কেবল তাঁর সামনে উপবিষ্ট মুহাম্মদের দিকে তাকিয়ে আছেন। এ যেন এক মহাকালের পরিচয়। অনন্তকাল থেকেই যেন খাদিজা চেনেন মুহাম্মদের মুখশ্রী। কী প্রশান্ত, কী প্রাণোচ্ছল। ঐশ্বরিক দ্যুতিতে ঝলমল করছে তাঁর মানব অবয়ব।


কিন্তু খাদিজা কীভাবে বলবেন তাঁর হৃদয়ের অভিব্যক্তি? নিজের অপারগতায় মুষড়ে যেতে থাকেন তিনি। এত দিন মুখে বলাটা যত সহজ ছিল, এখন কাজে পরিণত করাটা তার চেয়ে অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়াল।

[২]

বয়সের তারতম্যের বিষয়টি তো রয়েছেই, তা ছাড়া খাদিজা এত দিন মক্কার সব বড় বড় ব্যবসায়ী, গোত্রপতি, বীরদের বিয়ের প্রস্তাব না করে দিয়েছেন। এ বয়সে আর বিয়ে করবেন না বলে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছেন।


কিন্তু মুহাম্মদের প্রতি মুগ্ধতা তাঁর সকল প্রতিজ্ঞা ভেঙে শুঁড়িয়ে দিয়েছে। আল্লাহর প্রেরিত পুরুষের সহধর্মিণী হওয়ার সৌভাগ্যের পরশমণি তাঁর হৃদয়কে ব্যাকুল করে তুলেছে। কী করবেন কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। খাদিজা সারা দিন মনমরা হয়ে বসে থাকেন। মুহাম্মদের কথা ভেবে ভেবে পেরেশান হন। এত কাছে পেয়েও তিনি তাঁকে হারাবেন? আল্লাহর এত বড় উপহার করতলে আসার পরও তিনি গ্রহণ করতে পারবেন না? তাঁর চোখজুড়ে জমা হয় বেদনার অশ্রু। মাঝেমধ্যে তিনি ওয়ারাকার কাছে গিয়ে বিষণ্ন মন নিয়ে বসে থাকেন। পণ্ডিত ওয়ারাকা তাঁর বোনের এমন বেকারারি দেখে অস্থির হয়ে ওঠেন। তাঁকে পরামর্শ দেন আর কয়েকটা দিন ধৈর্য ধরার। আল্লাহ যেহেতু একবার মুহাম্মদের ভালোবাসায় খাদিজার হৃদয় আলোকিত করেছেন, নিশ্চয় তিনি এ আলোকে অন্ধকারে হারাতে দেবেন না।


দামেস্কের বাণিজ্য কাফেলা মক্কায় আসার পর তিন মাস গত হয়েছে। এর মধ্যে খাদিজা কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি। একবার ভেবেছেন সবকিছু পেছনে ফেলে এখনই গিয়ে মুহাম্মদের পাণিপ্রার্থী হবেন। আবার চিন্তা করেছেন-লোকজন কী বলবে? এ এমন এক ভাবনা, কারও কাছে মন খুলে বলা যায় না। তিনি ছোট্ট কিশোরীটি নন যে, যার তার কাছে হৃদয়ের ভালো লাগা প্রকাশ করবেন। তিনি পরিণীতা, নিজের মনোবেদনা নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখেন।

[৩]

এরই মধ্যে একদিন খাদিজার অন্তরঙ্গ বান্ধবী নাফিসা এলেন তাঁর বাড়িতে। নাফিসা বিনতে মুনিয়া সময়-সুযোগ পেলেই খাদিজার বাড়িতে আসেন। এবার আসতে একটু দেরি হয়ে গেছে, বেশ কিছুদিন তিনি বান্ধবীকে দেখতে আসেননি। কিন্তু এবার এসে খাদিজাকে কিছুটা অন্য রকম দেখতে পেলেন। এ খাদিজা আগের সেই ব্যক্তিত্বময়ী দৃঢ়প্রভায়ী খাদিজা নন। তাঁর মধ্যে একধরনের অস্থিরতা বিরাজমান। তাঁর কথার মধ্যে কেমন যেন অসংলগ্নতা। কী হয়েছে খাদিজার? মনে মনে ভাবতে লাগলেন নাকিস। খাদিজার অস্থিরতা লক্ষ করে একসময় নাফিসা জিজ্ঞেস করলেন, 'কী হয়েছে তোমার, খাদিজা? কোনো সমস্যা হয়নি তো? আমি তো অনেক দিন থেকে তোমাকে জানি, কিন্তু এমন অস্থির তো তোমাকে কখনো দেখিনি?'


নাফিসার কথায় খাদিজা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। কী বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না, চুপ করে রইলেন। আবার ভাবলেন, নাফিসা তো তাঁর অন্তরঙ্গ বান্ধবী। কারও না কারও কাছে তো বিষয়টি বলতেই হবে। না বললে সমস্যার সমাধান হবে না। অগত্যা শেষমেশ মুখ খুললেন নাফিসা, সখী আমার। আবদুল্লাহর ছেলে মুহাম্মদকে তো তুমি জানো। তিনি চারিত্রিক উৎকর্ষে প্রতিপালিত একজন যুবক তাঁর মতো চারিত্রিক নিষ্কলুষতাসম্পন্ন যুবক এর আগে আমি আর দেখিনি। তিনি সৎ, বিশ্বস্ত এবং পবিত্র একজন মানুষ। এমন মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার আগ্রহ যে কাউকে আকর্ষণ করবে। শুধু তা-ই নয়, তাঁর ব্যাপারে অনেক ঐশ্বরিক ও অলৌকিক ঘটনাও প্রকাশ পেয়েছে। অদ্ভুত সব বিষয় আমি জেনেছি। আমার ক্রীতদাস মায়সারা আমাকে তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বলেছে। এক খ্রিষ্টান পাদরি ভবিষ্যদ্বাণী করেছে তাঁর ব্যাপারে। দামেস্ক থেকে কাফেলা নিয়ে ফেরার পথে মেঘ তাঁকে ছায়াদান করেছে। এসব কথা যখন আমি শুনছিলাম, তখন আমার আমি আত্মহারা হয়ে গিয়েছিল।


আমি বিশ্বাস করি, মুহাম্মদ সেই নবি, যাঁর জন্য যুগ যুগ ধরে অপেক্ষা করা হচ্ছে বলতে বলতে খাদিজার চোখ-মুখ আগ্রহে জ্বলজ্বল করতে লাগল। মুহাম্মদের কথা বলতে গিয়ে কখন যে তাঁর মুখাবয়বে রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়েছে, তিনি খেয়াল করেননি।

[৪]

ও আচ্ছা, ঘটনা তাহলে এই নাফিসা বান্ধবীর রক্তিম মুখ দেখে বিষয়টির আদ্যোপান্ত আন্দাজ করতে পারলেন। ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমির হাসি লুকিয়ে আপ বাড়িয়ে বললেন, 'হলোই বা তিনি বিশেষ কেউ। কিন্তু তাঁর সঙ্গে তোমার এই দীর্ঘ দিন-রজনীর অস্থিরতার কী সম্পর্ক খাদিজা এবার আর কোনো বক্তব্যে গেলেন না। সরাসরি নাফিসার কাছে নিজের মনোবাসনা মুক্ত করলেন, 'আমি তাঁর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে চাই। কিন্তু জানি না এ কাজে আমি কীভাবে এগোব।'


বান্ধবীর এমন উদার আত্মসমর্পণে খুশিতে ভরে গেল নাফিসার হৃদয়। এমন শুভকাজে নাফিসা এগিয়ে না এসে পারেন না। তিনি নিজে এ কাজের দায়িত্ব নিলেন, 'তোমার যদি সম্মতি হয়, তাহলে এ ব্যাপারে আমি অগ্রসর হতে পারি।


খাদিজা বান্ধবীর সহসা সহযোগিতার কথা শুনে আগুত হলেন, তুমি অগ্রসর হও, বাদবাকি আল্লাহর হাতে। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম তখন চাচা আবু তালিবের বাড়িতে ছিলেন। বাড়িতে আবু তালিব এবং তাঁর স্ত্রীও ছিলেন। এমন সময় সেখানে নাফিসা এলেন। আবু তালিবের স্ত্রীকে সালাম দিয়ে নাফিসা বসে গেলেন সেখানে।


এ কথাসে কথা জিজ্ঞেস করলেন কিছুক্ষণ। একটু পর মুহাম্মদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস 'কী ব্যাপার, আপনি এখনো বিয়ে করছেন না যে?? প্রশ্নটা হঠাৎ হয়ে গেল, মুহাম্মদ এমন প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তাই তিনি সহজভাবে জবাব দিলেন, বিয়ে করার মতো প্রয়োজনীয় সম্পদ নেই আমার তেমন অবস্থা হলেই বিয়ে করে ফেলব।


নাফিসা কথা বাড়াতে লাগলেন, অর্থ-সম্পদ বিয়ের জন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়। অর্থ-সম্পদ খুব সহজেই ফুরিয়ে যেতে পারে, ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সততা, বিশ্বস্ততা, সচ্চরিত্র চিরকালীন: আপনার এ বিষয়টিও ভেবে দেখা দরকার।


মুহাম্মদের অগ্রহ দেখে তিনি কথা সামনে নিয়ে চললেন, 'অর্থ-সম্পদের বিষয়টি বাদ দিন। এমন কেউ যদি আপনাকে প্রস্তাব দেয়, যার পর্যাপ্ত অর্থ সম্পদ ও সম্মান প্রতিপত্তি রয়েছে এবং বংশমর্যাদায়ও যিনি অভিজাত, তাহলে কি আপনি বিয়ের জন্য রাজি হবেন?

[৫]

নাফিসা প্রকারান্তরে বোঝাতে চাইলেন, এমন একজন রয়েছেন আপনার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে ইচ্ছুক। মুহাম্মদের মনে স্বাভাবিক কৌতূহল জেগে উঠল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এ রকম মেয়ে...কে তিনি '


নাফিসা এক মুহূর্ত দেরি করলেন না। সঙ্গে সঙ্গে নামটি উচ্চারণ করলেন,


'খাদিজা।


মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম খাদিজার নামটি শুনে কিছুটা অবাক হলেন হয়তো। কিছুদিন আগেই মাত্র তিনি তাঁর ব্যবসায়িক পণ্য নিয়ে দামেস্ক থেকে ব্যবসা করে এলেন। খুব সংক্ষিপ্ত সময় তাঁরা কিছু কথাও বলেছেন। কিন্তু তাই বলে খাদিজার মতো সম্পদশালী নারী তাঁকে বিয়ে করার ব্যাপারে আগ্রহী। মক্কার ধনী আর প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাঁকে বিয়ে করার জন্য উদগ্রীব। সেখানে তাঁর মতো চাল-চুলোহীন এতিমকে খাদিজা সম্মানিত করতে চাচ্ছেন? তিনি একটু আশ্চর্য হয়ে নাফিসাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'এটা কীভাবে সম্ভব?'


নাফিসা মুহাম্মদের চেহারায় সম্মতির নীরব আলোড়ন দেখতে পেয়ে আরেকটু সাহসী হলেন। মুহাম্মদকে আশ্বস্ত করে বললেন, 'কীভাবে সম্ভব সেটি আমার ওপর ছেড়ে দিন। এ বিষয়টি আমি দেখব। নাফিসা আর কথা বাড়ালেন না। বান্ধবীর জন্য এটুকু করতে পারা তাঁর জন্য অনেক সৌভাগ্যের। বাছবীকে এখনই খুশির সংবাদটা জানাতে হবে।


খাদিজা নাসির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। নাফিসা আসতেই তিনি জানতে চাইলেন কী ঘটল আবু তালিবের বাড়িতে। নাফিসা সবিস্তারে তাঁকে জানালেন মুহাম্মদের মনোভাবের কথা। নাফিসার আশ্ববাণী শুনে খাদিজা চোখ বন্ধ করে ফেললেন। অদৃশ্য প্রভুর দরবারে শোকরিয়া আদায় করলেন

মনে। একই সঙ্গে তিনি এটাও ভাবলেন, মুহাম্মদ যেহেতু এ বিয়েতে সম্মত, সুতরাং আর দেরি করা উচিত নয়। তিনি মুহাম্মদের নামে এক বার্তা পাঠালেন


'হে মুহাম্মদ! আমার হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা ছিল আমি আপনার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হব। কারণ, আমরা একই বংশের। আপনার বিশ্বস্ততা, সততা, চারিত্রিক উৎকর্ষ আমাকে মুগ্ধ করেছে। এ কারণে আমি আপনার প্রতি আগ্রাহী হয়েছি। আপনি আপনার চাচাকে বিয়ের সকল বন্দোবস্ত করতে বলুন। মুহাম্মদ খাদিজার সম্মতিসূচক বার্তা জানালেন চাচা আৰু তালিবকে। আৰু তালিব এ সংবাদ শুনে খুশি হলেন। তিনি খাদিজার বাড়িতে গিয়ে তাঁকে এ বিয়ের জন্য মোবারকবাদ জানাতে ভুললেন না। খাদিজার পরে এ বিয়ে উপলক্ষে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছেন যিনি, তিনি আবু তালিব। তিনি তাঁর এ ভাতিজাকে অত্যধিক ভালোবাসেন এবং অত্যন্ত সম্মানের দৃষ্টিতে দেখেন। তিনি জানতেন, তাঁর ভাতিজার মতো চরিত্রবান ও ভালো মানুষ এ পৃথিবীতে আর একজনও নেই। তাই খাদিজার মতো বিদুষী নারী যখন মুহাম্মদকে বিয়ে করার ব্যাপারে আগ্রহী হলেন, তখন তিনি অন্য আর সবার চেয়ে বেশি খুশি হবেন, এটাই স্বাভাবিক। প্রাণভরে দোয়া করলেন এ অনাগত দম্পতির জন্য।


৭ম পর্ব পড়ুন: 👉এখানে ক্লিক করুন



No comments

Powered by Blogger.