উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রদিয়াল্লাহু এর জীবনী ৫ম পর্ব | Mother of the believers Khadija (RA)
হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রদিয়াল্লাহু আনহা
[১]
বাণিজ্য কাফেলা পৌঁছে গেল দামেস্কে। দামেস্কের বিরাট বাজার। রোম-পারস্য, আরব, আফ্রিকা আর হিন্দুস্তানের বড় বড় ব্যবসায়ীরা নানা রকম পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। চারদিকে ব্যবসায়ী আর বাজারিদের হাঁকডাক। মানুষের পদচারণে মুখর চারপাশ। ঘোড়া, উট, গাধার ঘেঁষা যেন নরক গুলজার করে রেখেছে পুরো দামেস্ক বাজার। মুহাম্মদ তার বাণিজ্যবহর নিয়ে বাজারের নির্দিষ্ট জায়গায় তাঁবু গাড়লেন। পণ্য সাজিয়ে বসে গেলেন কিছুক্ষণের মধ্যেই। মায়সারা চোখে চোখে রাখছেন মুহাম্মদকে। মুহাম্মদের প্রতিটি কাজ দেখতে দেখতে নিজেই যেন মুহাম্মদের ব্যক্তিত্বের প্রেমে পড়ে যাচ্ছেন। এমন নিষ্কলুষ আর কোমল হৃদয়ের মানুষও হয় এ পৃথিবীতে।
মায়সারা কোনো এক কাজে একটু অন্যদিকে গিয়েছিলেন। হঠাৎ শুনলেন। মুহাম্মদের সামনে দাঁড়িয়ে এক ইহুদি ব্যক্তি তর্ক করছেন। লোকটি উচ্চস্বরে বলছিলেন, 'তোমার কথার ব্যাপারে সত্যবাদী হলে তুমি লাত ও উজ্জা দেবতার নামে শপথ করো।' মুহাম্মদ মাথা নাড়লেন। যাঁর বক্ষ বিদীর্ণ করে ভরে দেওয়া হয়েছে একত্ববাদের সুদৃঢ় সিলমোহর, যাঁর হৃদয়কে আলোকিত করা হয়েছে আল্লাহর আসমাউল হুসনা দিয়ে, তিনি কীভাবে শপথ করবেন ভস্মীভূত মাটির তৈরি দেবতার নামে? লোকটি যতবার মুহাম্মদকে বলছেন শপথ করতে, মুহাম্মদ ততবারই অস্বীকার করে বলছেন, 'অসম্ভব। আমি কখনো এসবের নামে শপথ করব না। বরং আমি তো এগুলোর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমার মুখ ফিরিয়ে নিই।'
মায়সারা মুহাম্মদের কাছে এসে দাঁড়ালেন। কয়েকবার বলার পরও মুহাম্মদ যখন লাত-উজ্জার নামে শপথ করলেন না, তখন লোকটি পিছু হটে মায়সারাকে টেনে একদিকে নিয়ে গেলেন। মুহাম্মদকে দেখিয়ে বললেন, 'কখনো তাঁর সঙ্গ ত্যাগ কোরো না। কোনো সন্দেহ নেই, তিনি একজন নবি। শেষ নবি।'
[২]
মায়সারা আরেকবার মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকালেন যুবক মুহাম্মদের দিকে। খাদিজার কাছে বলার মতো দারুণ একটা তথ্য এইমাত্র তিনি আত্মস্থ করলেন। মায়সারা জানেন না, তাঁর মুগ্ধতা কেবল শুরু হয়েছে। ভবিষ্যৎ তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে আরও বিস্ময় নিয়ে।
সুচারুভাবে দামেস্কের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড শেষ হলো। মুহাম্মদ যে পণ্য নিয়ে এসেছিলেন দামেস্কের বাজারে, বেশ ভালো দামে বিক্রি করেছেন সেগুলো। পুঁজিগত মূলধন দিয়ে এখান থেকে নতুন করে আবার পণ্য কিনে নিয়ে যেতে হবে মক্কায়। বাজার ঘুরে সুবিধাজনক দামেই কিনতে পারলেন কাঙ্ক্ষিত পণ্য। এবার ফেরার পালা। সব পণ্য উট ও গাধার পিঠে সাজিয়ে মক্কার পথ ধরলেন যুবক ব্যবসায়ী মুহাম্মদ। দীর্ঘ পথ। একদিন দুপুরবেলা পথক্লান্তিতে বুসরা নামক এক জায়গায় এসে যাত্রাবিরতি করলেন তিনি। কাফেলা থামিয়ে একটি গাছের নিচে গিয়ে বসলেন। দুপুর রোদে একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার যাত্রা করবেন মক্কার পথে। মায়সারা কাছেই বসে পড়লেন। দুপুরের খাবারের আয়োজনটা সেরে ফেলবেন এই ফাঁকে। এমন সময় দেখলেন, দূর থেকে অপরিচিত এক বৃদ্ধলোক হস্তদন্ত হয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে আসছেন। লোকটি তাঁর দিকে এগিয়ে এলেও গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন বিশ্রামরত মুহাম্মদের দিকে। মায়সারা লোকটির
দৃষ্টির গভীরতা দেখে সচকিত হয়ে উঠলেন। লোকটিকে দেখেই মায়সারা চিনলেন তিনি খ্রিষ্টবিশ্বাসী নেন্তরিয়ান একজ পাদরি। নেজরিয়ান পাদরিটি হাঁপাতে হাঁপাতে মায়সারার কাছে এসে মুহাম্মদের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, 'ওই যে গাছের নিচে যে লোকটি বিশ্রাম নিচ্ছেন কে তিনি? চেনো তাঁকে? মায়াসারা কৌতূহলী হলেন। কেননা এর আগে তিনি দামেস্কের বাজারে নতুন কিছু শুনেছেন মুহাম্মদের ব্যাপারে। এ পাদরিও কি তেমন কোনো কথা বলবেন? তিনি বেশ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বললেন, 'তিনি মুহাম্মদ।
[৩]
মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ। মক্কার হাশিম গোত্রের একজন যুবক। পাদরির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তিনি মায়সারার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি যা জানি, তুমি তা জানো না। শুনে রাখো আমি শপথ করে বলছি, এই গাছের নিচে যিনি বসে আছেন, তিনি একজন নবি ছাড়া আর কেউ নন!'
মায়সারা আবার বিস্মিত হলেন। খাদিজা কি এ কারণেই তাঁকে মুহাম্মদের ছায়াসঙ্গী করে পাঠিয়েছেন? এ কারণেই কি তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ অনুসরণ করতে বলেছেন? খাদিজা কি মুহাম্মদের ব্যাপারে এই ভবিষ্যদ্বাণী আগে থেকেই জানেন?
পাদরির প্রশ্নে মায়সারার চিন্তায় ছেদ পড়ল। পাদরি তাঁর কাছে মুহাম্মদের ব্যাপারে আরও প্রশ্ন করতে শুরু করলেন। মুহাম্মদের জন্ম, বেড়ে ওঠা, তাঁর বংশ, তাঁর চারিত্রিক বলয়, তাঁর প্রভাব ও স্বভাব, তাঁর লেনদেন-সব বিষয়ে তিনি মায়সারাকে প্রশ্ন করতে লাগলেন। মায়সারা একে একে তাঁর সব কথার উত্তর দিলেন। সেই সঙ্গে সদ্য দামেস্ক বাজারে সংঘটিত বিতর্কের কথাটি বলতেও ভুললেন না।
মায়সারার কথা শুনে নেঙারিয়ান পাদরি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি ছুটে গেলেন বিশ্রামরত মুহাম্মদের কাছে। তিনি তাঁর কপালে চুমু খেয়ে অত্যন্ত সম্ভ্রমের সঙ্গে পায়ের কাছে বসে পড়লেন। মুহাম্মদ খ্রিষ্টান পাদরির এমন অকস্মাৎ প্রগলভতায় খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। কিন্তু পাদরির সেদিকে খেয়াল নেই। তিনি মুহাম্মদের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় বিশ্বাসের। সঙ্গে ঘোষণা করলেন, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি সেই প্রতিশ্রুত নবি, যাঁর ব্যাপারে তাওরাত ও ইঞ্জিলে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে।
[৪]
মায়সারা কাছ থেকে পাদরির কথা শুনলেন এবং তাঁর চলে যাওয়া প্রত্যক্ষ করলেন। এবার তাঁর দায়িত্ব যেন আরও বেড়ে গেল। নতুন নতুন প্রতিটি ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর তিনি আরও মনোযোগী হয়ে মুহাম্মদের সর্বদিকে খেয়াল দেওয়া শুরু করলেন। প্রতিটি ঘটনা খাদিজার কাছে পেশ করার উত্তেজনায় তিনি অস্থির হয়ে আছেন। খানিক বিশ্রামের পর কাফেলা আবার রওনা হলো। মায়সারার অভ্রভেদী চোখ সারাক্ষণ মুহাম্মদের ওপর। এক মুহূর্তের জন্যও আর তাঁকে আড়াল করা চলবে না।
দুপুরের তেজি রোদ বেশ তাতানো এখনো। দুরন্ত সূর্য যেন আগুনের হলকা ছোটাচ্ছে পথজুড়ে। মরুর চিকচিক মরীচিকায় চোখ রাখা দায় হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ মায়সারা দেখলেন, মুহাম্মদ যেখান দিয়ে উট নিয়ে যাচ্ছেন, সেখানে সূর্যের আলো ম্রিয়মাণ। তিনি আকাশের দিকে তাকালেন। অবাক কাণ্ড! আকাশের নীলিমায় এক খণ্ড ধূসর মেঘ মুহাম্মদের মাথার ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে। তিনি নিরীক্ষণের জন্য মেঘখণ্ডের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সত্যি, মুহাম্মদ যে পথ দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন, মেঘও ঠিক তাঁর মাথার ওপর দিয়ে সেদিকেই যাচ্ছে। দীর্ঘ কাফেলার আর সবখানে সূর্য করাচ্ছে মধ্যাহ্নের গনগনে কিরণ, শুধু মুহাম্মদের মাথার ওপর এক খণ্ড মেঘ তাঁকে শীতল ছায়া দিয়ে যাচ্ছে নিরলসভাবে। মায়সারার চোখ এ দৃশ্য দেখে ছানাবড়া হয়ে গেল। মনে মনে আওড়ালেন ধন্য তুমি মুহাম্মদ! ধন্য কুরাইশ রাজকুমারী খাদিজা।
খাদিজার দিন যেন ফুরোয় না। প্রতিদিন তিনি মুহাম্মদের কাফেলার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। কাফেলার জন্য নাকি মুহাম্মদের জন্য? হয়তো তা-ই হবে। হয়তো অপেক্ষা করছেন মায়সারার জন্য মুহাম্মদ সম্পর্কে সবকিছু জানার ব্যাপারে তিনি উদগ্রীব। প্রতিদিন বাড়ির দোতলা থেকে তিনি চেয়ে থাকেন সিরিয়ার পথপানে, কখন আসবে দামেস্কের কাফেলা।
[৫]
অবশেষে কাফেলার আগমনী পদধ্বনি শোনা গেল মক্কার উপকণ্ঠে। খাদিজার বুকের স্পন্দন তীব্র থেকে তীব্র হতে লাগল-কী খবর নিয়ে এসেছেন মায়সারা? কেমন আছেন মুহাম্মদ? পথে কোনো বিপদ হয়নি তো? ব্যবসায়িক পণ্যের ব্যাপারে তাঁর কোনো মাথাব্যথা নেই। ব্যবসা যা হওয়ার হোক, সবার আগে তাকে মুহাম্মদের খবর শুনতে হবে। মুহাম্মদ বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে সরাসরি চলে গেলেন মক্কার বাজারে।
সেটাই নিয়ম। দামেস্ক থেকে আমদানি করা সমুদয় পণ্য মক্কার বাজারে বিক্রি করে যাবতীয় হিসাব দাখিল করতে হয় নিয়োগদাতার কাছে। তাই তিনি খাদিজার বাড়িতে না এসে পণ্য নিয়ে মক্কার বাজারে গিয়ে সওদাগরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। যত দ্রুত সম্ভব তিনি এ কাজ সমাপ্ত করতে আগ্রহী।
মায়সারার সে দায় নেই। ব্যবসায়িক কাজের কোনো ফিরিস্তি তাঁকে দিতে হবে না। তাঁর কাজ ছিল সফরে মুহাম্মদের দেখভাল করা এবং তাঁর ছায়াসঙ্গী হয়ে সবকিছু অবলোকন করা। এখন তাঁর দায়িত্ব শেষ, আর দেরি না করে তিনি চলে এলেন খাদিজার কাছে। মুহাম্মদের ব্যাপারে চমকপ্রদ সব সংবাদ জমা করে নিয়ে এসেছেন খাদিজার জন্য। যে পর্যন্ত সেগুলো তাঁকে না জানাবেন, সে পর্যন্ত তাঁর শান্তি নেই। এত দিন পর্যন্ত অনেক কষ্টে বুকের ভেতর আটকে রেখেছেন অবিশ্বাস্য কথামালা। খাদিজা মায়সারার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তিনি আসতেই তাঁকে একান্তে ডেকে পাঠালেন। কৌতূহল বেশিক্ষণ চাপা দিয়ে রাখতে পারলেন না, জানতে চাইলেন তাঁর প্রতিবেদন। মায়সারাও অপেক্ষা করতে করতে পেরেশান। তাঁর চোখে-মুখে উত্তেজনার ছাপ। তিনি সবিস্তারে বলতে শুরু করলেন একদম প্রথম থেকে দামেজ যাওয়ার পথে যা ঘটেছে, যা ঘটেছে দামেঘের বাজারে ইহুদি ব্যক্তির সঙ্গে তর্ক করার সময় ফেরার পথে জেরিয়ান খ্রিষ্ট পাদরি যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, আকাশ থেকে ছায়া দানকাৰী সেই মেঘখণ্ড, মুহাম্মদের ব্যবসায়িক সততা, ব্যবসায়িক লেনদেনের ক্ষেত্রে তাঁর স্বচ্ছতা, অন্য আর সবার সঙ্গে চারিত্রিক আচরণ-সব তিনি খুলে বললেন খাদিজার কাছে। এ কদিনের জমানো সব কথা একনাগাড়ে বলে গেলেন।
খাদিজার হৃদয় খুশিতে আত্মহারা হওয়ার জোগাড়। কিন্তু মায়সারার সামনে সেটা প্রকাশ করলেন না। তাঁর সঙ্গে আরও কিছু কথা বলে তাঁকে বিদায় করে দিলেন। এবার তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা। খাদিজা মনে মনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন।
[৬]
খাদিজার চোখে-মুখে বেহেশতি দ্যুতি খেলা করছে। তাঁর হেঁটে চলার ছান্দসিক গতি দেখে মনে হচ্ছে, তাঁর যেন আজ দুটো ডানা গজিয়েছে। পাখির মতো ফুরফুরে হালকা হয়ে উড়ে যাচ্ছেন ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের বাড়ির দিকে। আজ তিনি ভয়হীন, নিঃশঙ্ক তাঁর হৃদয়। সন্দেহের সকল জড়তা উধাও হয়ে গেছে তার অন্তর থেকে। অবশেষে তাঁর অপেক্ষার দীর্ঘ প্রহর শেষ হতে চলেছে। আল্লাহর প্রেরিত মহাপুরুষের জন্য তাঁর ভালোবাসা পূর্ণতা পেতে চলেছে আজ।
খাদিজা খুশির আবাহন নিয়ে এলেন ওয়ারাকার কাছে। মায়সারার কাছে যা শুনেছেন মুহাম্মদের ব্যাপারে, সব খুলে বললেন। সব শুনে ওয়ারাকার দৃষ্টিহীন চোখেও চিকচিক করে উঠল আনন্দাশ্রু। তাঁর এত দিনের প্রতীক্ষা তবে শেষ হলো। সেই সে মহামানবকে তিনি নিজ চোখে দেখতে না পারলেও তাঁকে স্পর্শ করতে পারবেন, তাঁর কথা শুনতে পাবেন। সুযোগ হলে হয়তো তিনি তাঁর নবুওয়াতের রোশনিতেও বিভাসিত হতে পারবেন। বরিত হতে পারবেন শেষ নবির সম্মানিত উম্মত হিসেবে।
৬ষষ্ঠ পর্ব পড়ুন: 👉এখানে ক্লিক করুন

No comments