উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রদিয়াল্লাহু আনহা এর জীবনী ৪র্থ পর্ব | Mother of the believers Khadija (RA)
হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রদিয়াল্লাহু আনহা
ওয়ারাকার উল্লাসধ্বনি থামতে খাদিজা খানিকটা কেঁপে উঠলেন। যতটা খুশি হলেন, তার চেয়ে বেশি বিহ্বল হলেন। চাচাতো ভাই ওয়ারাকার কথার মধ্যে কিছুটা প্রচ্ছন্নতা জড়িয়ে আছে। তিনি ভূষিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, কোনো কথা বললেন না। খাদিজাকে চুপ করে থাকতে দেখে ওয়ারাকা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে এবার বলে উঠলেন, 'আমার কথা বিশ্বাস করো খাদিজা, শেষ নবি ইতিমধ্যে পৃথিবীতে আগমন করেছেন আর তুমি তাঁর স্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করবে। এমনকি তোমার জীবদ্দশাতেই তিনি নবুওয়াতপ্রাপ্ত হবেন। তাঁর আনীত ধর্ম সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে। তুমি হবে তাঁর ধর্মের প্রথম অনুসারী। আমি যদি আরও স্পষ্ট করে বলতে চাই তিনি হবেন এ কুরাইশ বংশের হাশেম গোত্রের একজন পুরুষ।" খাদিজা আর বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না, তাঁর হাত-পা কাঁপছে। মনে হচ্ছে, তিনি এখনই পড়ে যাবেন। হৃদয়ের সকল তন্নীতে যেন বয়ে যাচ্ছে অপার্থিব কোনো শোণিত ফোয়ারা। শরীরের প্রতিটি বিন্দু থেকে উচ্চারিত হচ্ছে আনন্দের গীতিকবিতা। খাদিজা এত আনন্দ সহ্য করতে পারছিলেন না, জলদি নিজের বাড়ি চলে এলেন।
এত দিন তিনি কেবল স্বপ্ন আর কল্পনার অলীক কুসুমে প্রতিপালিত করেছেন তাঁর অনাগত নবিকে, কিন্তু এখন যে তিনি বাস্তবতার খুব কাছে। তিনি যেন চোখ বন্ধ করলেই তাঁকে দেখতে পান চোখের আয়নায়। শেষ নবির সান্নিধ্যধন্য হওয়ার আনন্দ জড়িয়ে রাখে তাঁকে।
কিন্তু আবার নিজের দিকে তাকালে অনিচ্ছুক ভয় এসে জাপটে ধরে তাঁকে। তাঁর বয়স চল্লিশ ছুঁই-ছুই, যৌবনের পড়ন্ত বেলায় এসে দাঁড়িয়েছেন তিনি। ভাগ্য কি তাঁর প্রতি সুপ্রসন্ন হবে। খাদিজার মাথায় নিদারুণ চিন্তার ঝড় বইতে লাগল। স্বপ্নপুরুষ এত দিন কল্পনায় ছিল, সেই তো ভালো ছিল। কিন্তু এখন যে তাঁর আগমন অত্যাসন্ন।
[২]
তিনি প্রভুর দরবারে হাত পাতলেন- হে আল্লাহ! তুমিই বলে দাও, কোথায় গেলে পাব তাঁকে।
খাদিজা অপেক্ষা করছিলেন। পৃথিবী অপেক্ষা করছিল। সমগ্র সৃষ্টি প্রতীক্ষমাণ ছিল খাদিজা ও মুহাম্মদের শুভ পরিণয়ের জন্য। রাব্বুল আলামিন ধীরে ধীরে সাজিয়ে তুলছিলেন এই যুগলের ভালোবাসার অমর কাহিনিকাব্য । খাদিজা তাঁর কাঙ্ক্ষিত মানুষের আরেকটু কাছে আসার সুযোগ পেলেন।
মক্কায় এ বছর বেশ খরা চলছে। আশপাশের চারণভূমিগুলো বিরানপ্রায়। উট ও মেষ চরানোর মতো পর্যাপ্ত ঘাস পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও। অগত্যা মক্কার সামর্থ্যবান সবাই গ্রীষ্মের এ মৌসুমে সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যবসার জন্য দামে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। সেখানে গেলে সবারই কিছু না কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। কুরাইশনেতা আবু তালিব বংশমর্যাদায় যথেষ্ট প্রভাবশালী হলেও তাঁর সাংসারিক অবস্থা ততটা সচ্ছল নয়। আর তাঁর ছেলেসন্তানদের কেউ এখনো এতটা শক্ত সামর্থ্যবান হয়ে ওঠেনি যে তাদের মেষ চরানো বা ব্যবসার কাজে লাগাবেন। তাঁর পরিবারে প্রতিপালিত ভ্রাতুষ্পুত্র মুহাম্মদই তাঁর পরিবারের রোজগারের অনেকখানি বহন করেন। তাঁর সঙ্গে ব্যবসার কাজে নামেও যান বা মেষপাল নিয়ে চারণভূমিতে যান, এটা তাঁর জন্য অনেক সন্তোষের।
আবু তালিবের বয়স হয়েছে। বয়সের ভারে এখন বড় একটা এদিক সেদিক যেতে পারেন না। কিন্তু এ বছর ব্যবসার জন্য নামে না গেলেই নয়, সংসারের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। আবার তাঁর নিজেরও তেমন কোনো অর্থ-সম্পদ নেই, যার দ্বারা ভাতিজা মুহাম্মদকে পুঁজি দিয়ে ব্যবসায় পাঠাবেন। কয়েক দিন দুশ্চিন্তার দোলাচলে রইলেন তিনি।
[৩]
ওদিকে খাদিজার ব্যবসায়িক অর্থ-সম্পদ বা কাজের লোকজনের অভাব নেই। নিজস্ব পণ্য ছাড়াও তিনি লাভ-লোকসানের ভিত্তিতে অন্য ব্যবসায়ীদের ব্যবসার জন্য মূলধন প্রদান করে থাকেন। তাঁরা ব্যবসা শেষে চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত মুনাফা খাদিজাকে বুঝিয়ে দেন। এসব কাজে খাদিজার নিয়োগপ্রাপ্ত লোক আছে। তা ছাড়া তাঁর ভাগনে হাকিম ইবনে হিজামও ব্যবসার অনেক কিছু দেখভাল করেন। কিন্তু তবু এবারকার গ্রীষ্ম মৌসুমে ব্যবসা পরিচালনার জন্য নতুন একজন লোক চেয়ে
মক্কায় ঘোষণা দিলেন, যাকে তিনি ব্যবসার দায়িত্ব দিয়ে দামেস্কে পাঠাবেন। খাদিজার নতুন লোকের প্রয়োজন ছিল না। আর প্রয়োজন হলেও সেটা ঘোষণা করে বলার দরকার ছিল না। তিনি ইচ্ছা করলে যেকোনো একজন ভালো ব্যবসায়ীকে ডেকে এ দায়িত্ব তাঁর কাঁধে তুলে দিতে পারতেন। শুধু তাই নয়, তিনি তাঁর ঘোষণার মধ্যে শর্ত জুড়ে দিলেন-আগ্রহী ব্যক্তিকে অবশ্যই বিশ্বস্ত এবং আমানতদার হতে হবে।
তাঁর চারিত্রিক নিষ্কলুষতাও তাঁর নিয়োগের অন্যতম শর্ত হিসেবে বিবেচিত হবে। মূলত খাদিজা ব্যবসার জন্য লোক খুঁজছিলেন না, তিনি খুঁজছিলেন সত্যিকারের মহামানবকে। তিনি জানতেন, তাঁর চাচাতো ভাইয়ের কথামতো অনাগত নবি যদি সত্যি আরবে আগমন করে থাকেন, তবে তাঁর চারিত্রিক
নিষ্কলুষতা এবং বিশ্বস্ততা হবে সবার চেয়ে নিখুঁত। যাঁর চরিত্রে কখনো স্পর্শ করেনি সামান্য পক্ষিলতা।
কিন্তু এমন লোক তিনি কীভাবে খুঁজে বের করবেন? মক্কা ও এর আশপাশের এলাকায় হাজারখানেক কুরাইশি লোকের বসবাস। তাদের মধ্য থেকে কেবল চারিত্রিক বিদূষিতা গুণ ধরে খুঁজতে গেলে সেটা অত্যন্ত কঠিনসাধ্য কাজ হয়ে যাবে। এ কারণেই তিনি ব্যবসার কথা বলে নিজের কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে খোঁজার পদ্ধতি অবলম্বন করলেন। আবু তালিব লোকমুখে শুনতে পেলেন খাদিজার ঘোষণা। এমন দুর্দিনে তিনি কিছুটা আশার আলো দেখতে পেলেন। খাদিজার শর্তগুলো তাঁকে আরও আশান্বিত করল। কেননা তিনি ভালো করেই জানেন, বিশ্বস্ততা ও চারিত্রিক নিষ্কলুষতায় তাঁর ভাতিজার তুল্য নেই সারা আরবে। তা ছাড়া ব্যবসায়ী হিসেবেও তাঁর ভাতিজা ফেলনা নন, তিনি নিজে দুবার তাঁকে দামেস্কে নিয়ে গিয়েছিলেন ব্যবসার সঙ্গী করে। সে হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতাও কম নয়। খাদিজার এমন ঘোষণা শুনে তাই তিনি দেরি করলেন না, ভাতিজা মুহাম্মদকে আনালেন বিষয়টি।
[৪]
আবু তালিব মুহাম্মদকে ডেকে বললেন, 'ভাতিজা, তুমি তো জানোই আমি বিত্তহীন একজন মানুষ। এ বছর দুর্ভিক্ষের ফলে দারুণ অভাবে পড়েছি আমরা। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ব্যবসা বা অন্য কোনো উপায়, উপকরণ এ মুহূর্তে আমার হাতে নেই। আজ শুনলাম আমাদের গোত্রের একটি বাণিজ্য কাফেলা শিগগির দামে যাচ্ছে। এ কাফেলায় ধনাঢ্য খাদিজা বিনতে জুয়াইলিদের অনেক পণ্যও যাবে। সে তার বাণিজ্যবহর পরিচালনার জন্য একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি তালাশ করছে। নানা কারণে যদিও আমি তোমাকে আমার চোখের আড়াল করতে চাই না এবং সংগত কারণে ইহুদিদের থেকে আমি তোমার ক্ষতিসাধনের শঙ্কা করি; কিন্তু বুঝতেই পারছ, এ ছাড়া আমার আর কোনো গত্যন্তর নেই। যদি তুমি তার কাছে যাও, তবে আমি নিশ্চিত যে সে তোমাকে তার ব্যবসার জন্য নির্বাচন করবে। তোমার সত্যবাদিতা ও চারিত্রিক উৎকর্ষের ব্যাপারে তার সম্যক অবগতি থাকার কথা মুহাম্মদ চাচার কথা শুনে তাঁর সম্মতি প্রকাশ করলেন।
তিনি চাচাকে এ বিষয়ে কথা বলতে বললেন। কিন্তু আবু তালিবের যে বংশমর্যাদা এবং জাত্যাভিমান, তাতে ভাতিজার পক্ষে স্বপ্রণোদিত হয়ে খাদিজার কাছে গিয়ে কাজের ব্যাপারে আগ্রহ দেখানোটা শোভন দেখায় না। কিন্তু না গেলেও যে নয়। একটা দোটানায় পড়ে গেলেন তিনি।
এ সমস্যার সমাধানে এগিয়ে এলেন আবু তালিবের বোন ও মুহাম্মদের ফুফু আতিকা বিনতে আবদুল মুত্তালিব। ফুফু আতিকার বিয়ে হয়েছে খাদিজার ভাই আওয়ামের সঙ্গে। ভাবি হিসেবে খাদিজার সঙ্গে আতিকার সুসম্পর্ক রয়েছে। মুহাম্মদের সম্মানের কথা ভেবে তিনিও তাঁর ভাই আবু তালিবকে নিষেধ করলেন তাঁকে খাদিজার কাছে পাঠানোর জন্য। বরং তিনি নিজে গিয়ে প্রথমে আলাপ করলেন মুহাম্মদের আমানতদারি এবং তাঁর নিষ্কলুষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে।
[৫]
আতিকা বিনতে আবদুল মুত্তালিব খাদিজার কাছে মুহাম্মদের ব্যাপারে বলার আগে আরও বেশ কয়েকজন কুরাইশি ব্যক্তি খাদিজার কাছে এসেছে এ কাজে নিয়োগ পাওয়ার জন্য। কিন্তু খাদিজা তাদের সবার জীবনবৃত্তান্ত ঘেঁটে দেখেছেন এরা কোনোভাবেই নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী নয়। কেউ হয়তো পরনারীতে আসক্ত, কেউবা শরাবে আসক্ত, কেউ জুয়া-পাশার দানে পারঙ্গম, কারও বিশ্বস্ততা ও সত্যবাদিতার ব্যাপারে প্রশ্ন তোলাটা বৃথা, কেউ আবার ব্যবসার আদর্শলিপি সম্পর্কে একেবারে অম্ল। তিনি প্রতিদিন এ রকম লোকদের সাক্ষাৎ পাচ্ছিলেন আর দু-এক কথা বলে তাদের বিদায় করে দিচ্ছিলেন। মনের ছাঁচে যার ছবি আঁকা, সে ছবির সঙ্গে মিলছিল না কারও কায়া।
ভ্রাতৃবধূ আতিকার কাছে মুহাম্মদের কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে খাদিজার ভেতরে অন্য রকম এক কম্পন শুরু হয়ে গেল। মুহাম্মদ আহমদ! আল-আমিন! এই কি সেই ব্যক্তি? এই কি সেই সত্যধারা প্রবাহের শেষ সমীরণ?
ওয়ারকার ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী সেই নাম, সেই বংশ, চারিত্রিক উৎকর্ষে সেই রাজটীকা, ভদ্রতা আর মানবতায় যিনি তুলনাহীন, যাঁর সত্যবাদিতা আর বিশ্বস্ততার কাহিনি সুবিদিত পুরো মক্কায়। এ মুহাম্মদ কি সেই তিনি নন? আহা ! কোথায় খুঁজেছি এত দিন তাঁকে আমি অধীর হয়ে তাঁর অপেক্ষায় প্রতীক্ষমাণ
থেকেছি। হৃদয় থেকে উৎসারিত হতে লাগল-এত দিন কোথায় ছিলেন?
খাদিজা দেরি না করে খবর পাঠালেন আবু তালিবের কাছে। আবু তালিব মুহাম্মদকে না পাঠিয়ে নিজে এলেন। মুহাম্মদকে পাঠানোর আগে কিছু বিষয়ে আলোচনা করে নেওয়া দরকার। তিনি খাদিজার কাছে এসে তাঁর ভাতিজার উত্তম গুণাবলি বর্ণনা করলেন। এটা করলেন যতটা না খাজিদাকে বোঝাতে, তাঁর চেয়ে নিজের হৃদয়ের দুশ্চিন্তা ও শঙ্কা প্রশমন করতে। কেননা তিনি এর আগে মুহাম্মদকে নিয়ে যখন দামেস্ক সফর করেছিলেন, তখন এক ইহুদি পাদরির মুখে ভাতিজার ব্যাপারে অস্বাভাবিক কিছু কথা শুনেছিলেন। সে কথাগুলো এখনও তাঁর মনে পাথরের মতো ভারী হয়ে আছে। তিনি কারও কাছে তা প্রকাশ করতে পারেননি। কেননা এ সময়ের ইহুদিরা যদি মুহাম্মদের এমন ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে জানতে পারে, তবে তাঁকে হত্যা করতে কসুর করবে না মোটেও। হিংসার বশবর্তী হয়ে এর আগে তারা নবি ঈসা (আ.)-কে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল। তারও আগে তারা হত্যা করেছে শত শত নবিকে। এই ভয়ে ভাতিজাকে তিনি সব সময় নিজের কাছে আগলে রাখেন।
খাদিজার কাছে মুহাম্মদের ব্যাপারে বলার পর তিনি দাবি করলেন-অন্যদের আপনি আপনার ব্যবসা পরিচালনার জন্য যে পারিশ্রমিক প্রদান করেন, মুহাম্মদকে তার দ্বিগুণ দিতে হবে। কেননা তাঁর ব্যক্তিত্ব অন্য সবার চেয়ে আলাদা, ব্যবসায়িক হিসেবে তাঁর সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততাও অন্যদের থেকে তুলনাহীন। সুতরাং একটি নয়, পারিশ্রমিক হিসেবে তাঁকে দুটি উট প্রদান করতে হবে। খাদিজা আবু তালিবের কথা মন দিয়ে শুনছিলেন। তিনি কি সত্যিই আবু তালিবের কথা শুনছিলেন?
[৬]
তাঁর শারীরিক অবয়ব উপবিষ্ট ছিল আবু তালিবের
সামনে, কিন্তু সমগ্র অন্তরাত্মা ভেসে বেড়াচ্ছিল অন্য কোথাও। তাঁর চোখ খোলা কিন্তু তাঁর চোখের তারায় ঝিকমিক করছিল অন্যলোকের অপার্থিব ছায়াছবি। খাদিজা আবু তালিবের কথায় সম্মতি জ্ঞাপন করলেন। আবু তালিব যা দাবি করলেন, সব বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিলেন। যাঁর পায়ের সামনে লুটিয়ে দিতে পারেন তাঁর সমস্ত সর্বস্ব, সেখানে দুটি উট তো তাঁর কাছে তুচ্ছ। তিনি আবু তালিবকে শুধু বলতে পারলেন, 'হে আবু তালিব। আপনি আপনার ভাতিজার জন্য যা দাবি করেছেন তা অসাধ্য নয় এবং তা সন্তোষজনক পারিশ্রমিক। আমি শপথ করে বলছি, আপনি যদি এর চেয়ে অধিক কিছু দাবি করতেন, তবে আমি তা দিতেও প্রস্তুত।
যুবক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম খাদিজার কাছে এলেন ব্যবসার যাবতীয় নির্দেশনা বুঝে নেওয়ার জন্য। খাদিজা নির্ণয়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন এ যুবকের দিকে। আগে যদিও দু-একবার তাঁদের দেখা হয়েছে, কিন্তু এবারকার সাক্ষাৎ একেবারেই অন্য রকম। বিশেষত খাদিজার
কাছে তো এ চন্দ্রাভিযানের সমতুল্য।
তাঁর অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি ঘুরে বেড়াতে লাগল
মুহাম্মদের মুখাবয়ব, তাঁর চাহনি, কথা বলার ভঙ্গি, অঙ্গচালনা, তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রতিটি সূক্ষ্ম প্রকাশে।
খাদিজার চোখজুড়ে মুগ্ধতা ছড়িয়ে আছে। তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সেই মানব। সত্যিই কি তিনি? হৃদয় অলিন্দে এখনো কয়েক বিন্দু দোলাচল জমে আছে। না, তিনি কোনো সন্দেহের দোলাচলে দুলতে রাজি নন।
তিনি তাঁকে তুলে ধরতে চান সকল সন্দিগ্ধতার ঊর্ধ্বে। হৃদয় থেকে যখন মুছে যাবে সন্দেহের সকল তমসা, তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন।
খাদিজা তাঁর বিশ্বস্ত ক্রীতদাস মায়সারাকে একান্তে ডাকলেন। প্রথমেই তাঁকে জানালেন, এই বাণিজ্য সফরে তাঁকে মুহাম্মদের ভৃত্য হয়ে যেতে হবে। কিন্তু এটা তাঁর মূল দায়িত্ব নয়, তাঁর কাজ হচ্ছে মুহাম্মদের ছায়াসঙ্গী হয়ে তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ অনুসরণ করা। তাঁর প্রতিটি কাজ, প্রতিটি কথা, অন্যদের সঙ্গে আলাপচারিতা, ব্যবসায়িক আলোচনা সব যেন তিনি তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেন। শুধু তা-ই নয়, যাওয়া-আসার পথে প্রতিটি ঘটনা তাঁকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখতে হবে। মুহাম্মদের একটি কদমও যেন তাঁর অগোচরে কোথাও না পড়ে।
নির্দিষ্ট সময়ে প্রস্তুতি সম্পন্ন করে কাফেলা রওনা হলো সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের পথে।
৫ম পর্ব পড়ুন: 👉 এখানে ক্লিক করুন

No comments