উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রদিয়াল্লাহু আনহা এর জীবনী ৩য় পর্ব | Mother of the believers Khadija (RA)
![]() |
হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রদিয়াল্লাহু আনহা
ওয়ারাকাও পছন্দ করেন খাদিজাকে। শুধু যে তাঁর যশস্বী খ্যাতি ও বৈভবের প্রাচুর্য রয়েছে এ জন্য নয়, তিনি পছন্দ করেন তাঁর ধৈর্যের স্নিগ্ধতা ও ধর্মীয় জ্ঞানের প্রতি প্রবল অনুসন্ধিৎসার জন্য। এ কারণে খাদিজার দ্বিতীয় স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি তাঁকে বিয়ের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। কিন্তু খাদিজা তাঁর চাচাতো ভাইয়ের প্রস্তাব হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তিনি যেন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছেন- হয়তো সেই অনাগত তিনি, নয়তো কেউ নয়। খাদিজা বাড়ির আঙিনায় ঢুকতেই সচকিত হয়ে উঠলেন ওয়ারাকা। বাতাসের ঢেউ তাঁর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ে কিছু একটা বলে গেল। তিনি বলে উঠলেন,
'কে, খাদিজা?' খাদিজা ধীর পায়ে ভাইয়ের কাছে এসে বসলেন। মাথা নেড়ে জবাব দিলেন, 'হ্যাঁ, আমি!' খাদিজার আগমনে খুশি হয়ে উঠল ওয়ারাকার মুখ। সহাস্যে বললেন,
"আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল আজ তুমি আসবে। খাদিজা টিপ্পনী কেটে জবাব দিলেন, 'সে তো আপনি জানবেনই, আপনি যে ভবিষ্যদ্বক্তা।
খাদিজার কথায় মাথা নেড়ে অস্বীকৃতি জানালেন ওয়ারাকা, না খাদিজা, আমি কখনো কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করি না আর আমি ভবিষ্যদ্বক্তাও নই। আমি কেবল সেসব কথাই তোমাকে বলি, যা আমি পূর্বেকার বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থে পাঠ করেছি, যা আমি বিভিন্ন ধর্মের সত্যানুসন্ধানী পুরোহিতদের থেকে শ্রবণ করেছি। আমি গুনিন নই, জ্যোতিষীও নই। তবে নক্ষত্র বিষয়ে আমার জ্ঞান রয়েছে। যেমন জ্ঞান রয়েছে প্রাচীন শিলালিপি আর ঐতিহাসিক নিদর্শন বিষয়ে। হয়তো কিছু প্রজ্ঞা প্রাপ্ত হয়েছি মানুষের স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যাকার হিসেবে। এসবই আমার লব্ধ জ্ঞান, আল্লাহ থেকে প্রদেয় দানমাত্র।'
[২]
ওয়ারাকা কথা বলেন কবিতার মতো। বরাবরই সুললিত, প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের বিভূতি তাঁর সে কাব্যিক বহিঃপ্রকাশকে আরও বার করে তোলে। খাদিজা মুগ্ধ হয়ে তাঁর কথা শুনছিলেন। কিন্তু পরক্ষণে তাঁর মনে পড়ে গেল কেন তিনি এখানে এসেছেন। বললেন, 'আজ কাবাচত্বরে এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছে।'
ওয়ারাকা মনোযোগী হলেন। তিনি জানেন, খাদিজা অনর্থক কোনো কথা বলার জন্য কখনো আসেন না। খাদিজা বলতে লাগলেন, কিছুক্ষণ আগে মক্কার কয়েকজন নারী যখন কাবার তাওয়াফ করছিল, তখন কোত্থেকে যেন এক বৃদ্ধলোক এলেন কাবার পাশে। সম্ভবত ইহুদি, পোশাক-আশাকে তা-ই মনে
হলো। তিনি কাবার পাশে এক উঁচু বেদিতে দাঁড়িয়ে হঠাৎ নারীদের উদ্দেশ করে বলতে লাগলেন, এ মক্কায় খুব জলদি একজন নবি আসবেন। তোমাদের মধ্যে যার খোশনসিব হয়, সে যেন সেই নবির স্ত্রী হয়ে যায়। আগন্তুক বৃদ্ধের কথা শুনে কেউ কেউ তো হেসে উঠল আর কয়েকজন তেড়ে গেল লোকটিকে মারতে। নারীদের এমন রুদ্রমূর্তি দেখে লোকটি কোনো রকমে পালিয়ে বাঁচল। কিন্তু লোকটির কথাগুলো শোনার পরপর আমার মনে এল উম্মে কিতালের কথা, তিনিও তো নবির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এ কথা মনে আসতেই আমি আপনার কাছে চলে এলাম। ওয়ারাকা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লোকটির বিবরণ ঘটনার আদ্যোপান্ত জানতে লাগলেন খাদিজার কাছে। সবকিছু শুনে বেশ কিছুক্ষণ ক্ষয়িষ্ণু দৃষ্টির চোখ নিচু করে নীরব রইলেন। তারপর বলতে শুরু করলেন, 'নবি আসবেন, খুব শিগগির আসবেন। নবি আগমনের সকল নিদর্শন পরিস্ফুটিত হতে শুরু করেছে।
[৩]
চারদিকে ঘোর তমসা এখন মানুষের মাঝে মনুষ্যত্ব বলতে কিছু নেই আর। জুলুম-পাপাচারে ছেয়ে গেছে ধরণিতল। মানুষ মানুষের খোদা সেজে বসেছে, মানুষ লিপ্ত হয়েছে মূর্তি আর দেবতার পূজায়। কিন্তু এ আঁধার ঘুচবেই। এ অন্ধকারের কালিমা ভেদ করে নতুন আলোকবর্তিকা হাতে একজন নবির আগমন অভ্যাসন্ন হয়ে পড়েছে। তিনি আসবেন। তিনি এ আরবে আসবেন। হতে পারে তিনি এ মক্কা নগরীতেই আবির্ভূত হবেন। তুমি যদি আমার কাছে জানতে চাও তিনি দেখতে কেমন হবেন, কোন বংশে আসবেন, কেমন হবে তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তবে এখন আমি তোমাকে তা বলতে পারব না। তার জন্য তোমাকে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তাঁর নাম হবে আহমদ, আহমদ নামেই তিনি পরিচিত হবেন তাঁর দেশে।
খাদিজার হৃদয় আনচান করে ওঠে। তাঁর হৃৎস্পন্দনে কথা বলে ওঠে অ্য কেউ। অনাগত একজন মানুষের জন্য তাঁর হৃদয় থেকে কেন অযথাই উলে ওঠে প্রেমের সরোবর?
আজকাল খাদিজার ঘুম খুব কম হয়। রাতে স্বস্তিতে ঘুমোতে পারেন না। একটু ঘুমোলে কী সব স্বপ্ন দেখেন, সে স্বপ্নের বাস্তবতা তিনি বুঝে ওঠতে পারেন না। স্বপ্নের মাঝে প্রায়ই দেখেন আকাশ থেকে নেমে আসছে রুপালি ধবধবে আলোক বিচরণ। সে আলো তাঁর ঘরের ছাদ তেন করে আশ্রয় নিচ্ছে তাঁর সমগ্র সত্ত্বায়, তাঁর কোলজুড়ে ছোটাছুটি কাছে কলমলিয়ে। ঝলমল করাতে করতে সে আলো মিনারের মতো অবয়ব নিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সারা ঘরে ঘর থেকে শিগ্ধ শুভ্র-শিখা হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে পুরো মক্কা, মক্কা থেকে জাজিরাতুল আরব, আরব থেকে পুরো কায়েনাত আলোকিত হয়ে উঠছে সে আলোক মঞ্জুরিতে। এরপর তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। একটু এদিক-সেদিক করে একই স্বপ্ন প্রায় দেখেন। তিনি বুঝতে পারেন না কেন বারবার একই স্বপ্ন দেখেন। মাঝেমধ্যে এমন স্বপ্ন দেখে হাঁপিয়ে ওঠেন। বিছানায় বসে একা একা ভাবেন নিজের অতীত জীবন নিয়ে। নিজের বৈধব্য নিয়ে ভাবেন অনেক সময়। বয়স ৩০ পেরিয়েছে, এরই মধ্যে দু-দুবার বিদগ্ধ স্বাদ পেয়েছেন বৈধব্যের জীবন নিয়ে একধরনের বিতৃষ্ণ হয়ে গেছেন তিনি। বিয়ে বিষয়টির প্রতি একটা বিরাগ চলে এসেছে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছেন বিয়েমুখো আর হচ্ছেন না এ জীবনে।
[৪]
দ্বিতীয় স্বামী আতিক ইবনে আইয়াদ পরলোকগমন করেছেন বেশ কিছুদিন হলো,এরই মধ্যে মক্কা এবং আশপাশের নানা গোত্র থেকে প্রতিদিন দু-একজন আসছে তাঁর কাছে বিয়ের পয়গাম নিয়ে। তিনি সবাইকে সাফ জবাব দিয়ে দিচ্ছেন, 'বিয়ের বিষয়ে আপাতত কিছু ভাবছি না। দয়া করে মাফ করবেন আমাকে।' সাধারণ পাণিপ্রার্থীদের তো দু-এক কথায় বোঝানো যায়, কিন্তু কোনো গোত্রপতি বা নামজাদা ব্যক্তিদের নিয়ে বাধে বিপত্তি। তাঁরা কিছুতেই হাল ছাড়তে চান না। তা ছাড়া খাদিজার কাছে একবার বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার পর সেটা আবার কবুল না হলে গোত্রপতিদেরও বেশ আঁতে ঘা লাগে বৈকি। এই তো কিছুদিন আগে মক্কার আবুল হাকাম (আবু জেহেল) বেশ ঘটা করে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। আবুল হাকামের প্রস্তাব খাদিজা হাসিমুখে ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। এতে বেশ মনঃক্ষুণ্ণ হন তিনি। আশপাশের লোকজনের সঙ্গে নাকি বেশ চোটপাটও দেখান এ বিষয়ে। অবশ্য তাতে কিছু যায় আসে না খাদিজার।
মক্কার সবচেয়ে বিত্তশালী নারী তিনি। তাঁর সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে লোকজন তাঁকে কুরাইশ রাজকুমারী' নামে ডাকে। ব্যবসায়ী হিসেবে তাঁর সুনাম শুধু মকা নয়, ছড়িয়ে আছে সুদূর রোম-পারস্য, ইয়েমেন, গাসসাসিনা হিরা ও দামেস্ক পর্যন্ত। গ্রীষ্মকালীন ব্যবসা মৌসুমে পুরো মক্কার ব্যবসায়ীদের যে পণ্যসামগ্রী সিরিয়ায় রপ্তানি হয়, খাদিজার একার পণ্য রপ্তানি হয় তাঁদের সমুদয় পণ্যের চেয়ে অধিক। আবার শীতকালীন মৌসুমে যখন তাঁর পণ্য ইয়েমেন অভিমুখে রওনা হয়, তখন তাঁর উটের কাফেলায় ভরে যায় মজার প্রশ্নের। সুতরাং, এমন ধনবর্তী নারীকে বিয়ে করতে উৎসাহী হওয়ার কারণ সবার কাছে স্পষ্ট।
কিন্তু খাদিজার নতুন করে বিয়ে-শাদি কিংবা ঘর-সংসারে ব্রতী হতে তেমন আগ্রহ নেই। কীভাবে আগ্রহ হবে? তাঁর স্বপ্নে যে আজকাল ধরা দিচ্ছে ঊর্ধ্বলোকের আলোকবিতা! কেমন করে তিনি অগ্রাহ্য করবেন এ আলোর ঝরনাধারার স্বর্গীয় সম্মোহন। চাচাতো বোন উম্মে কিতালের সেই ভবিষ্যদ্বাণী মনের মধ্যে ফুটিয়ে তুলছে বেহেশতি গুলিস্তান। চাচাতো ভাই ওয়ারাকার প্রান অনুধাবন তার মনমুকুরে যেন উদাত্ত করছিল আকাঙ্ক্ষার নতুন চারাগাছ।
[৫]
মনে দ্বিধা-সত্যিই কি তিনি আমার হবেন? যিনি আসবেন সকল তমসার জীর্ণতাকে বিদীর্ণ করে। যিনি এ মানবতাকে নতুন এক আলোয় বিভাসিত
করবেন। নবুওয়াতের হিরণ্ময় জ্যোতিতে বিধৌত করবেন তামাম জাহান।
তবে কেন আমি প্রতিদিন এমন স্বপ্ন দেখি? নিশ্চয় এর কোনো ঐশ্বরিক ইশারা রয়েছে! এমন ভাবনায় খাদিজা আপ্লুত হন।
আল্লাহ তাআলা খাদিজাকে অঘোষিত নবির জন্য প্রস্তুত করছিলেন। তাঁর অন্তঃকরণকে তৈরি করছিলেন রাসুলের ভালোবাসার জন্য। তাঁর হৃদয়ের সিংহাসন সজ্জিত করছিলেন নবি মুহাম্মদের জন্য।
স্বপ্নের অলৌকিক আলোক বিচ্ছুরণের কথা জানানোর জন্য খাদিজা এলেন ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের কাছে। তাঁর কাছে খুলে বললেন প্রতিটি স্বপ্নের আদ্যোপান্ত, যা যা দেখেন তিনি স্বপন মাঝার, যা কিছু ঘটে তাঁর ঘুমঘোরে। ওয়ারাকার চোখের কোণে এক বিন্দু জল টলমল করে উঠল। খাদিজার কথা শেষ হতেই তিনি দুই হাত উত্তোলিত করে উল্লাসধ্বনি করে উঠলেন, সুসংবাদ। মারহাবা, হে আমার বোন। তোমার জন্য এ এক অবশ্যম্ভাবী সুসংবাদ, খাদিজা! এ স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার জন্য এক ঐশী উপহার। এ আলোর অবয়ব খুব শিগগির আল্লাহ তোমাকে দান করবেন। সবকিছু আল্লাহই ভালো জানেন, কিন্তু তুমি বিশ্বাস করো এ আলো কেবল একজন নবির হতে পারে। এ আলোক বিচ্ছুরণ একজন নবির আগমনকে ইশারা করে।
৪র্থ পর্ব পড়ুন: 👉 এইখানে ক্লিক করুন

No comments