উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রদিয়াল্লাহু আনহা এর জীবনী ৭ম পর্ব | Mother of the believers Khadija (RA)
হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রদিয়াল্লাহু আনহা
[১]
মক্কায় বিয়ের বিয়ের আয়োজন চলতে লাগল। কুরাইশ ছাড়াও অন্যান্য গোত্রের লোকজন জেনে গেল মুহাম্মদ ও খাদিজার শুভ পরিণয়ের কথা। সবাই এ যুগলবন্ধনকে আশীর্বাদ দিতে লাগল। তবে যারা এর আগে খাদিজাকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছিল, তাদের অনেকে এমন সংবাদ শুনে রুষ্ট হলো। বিশেষত, আবু জেহেল খাদিজার সঙ্গে মুহাম্মদের বিয়ের কথা শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল, 'খাদিজা কি বিয়ে করার জন্য আবু তালিবের ঘরে আশ্রিত এক এতিম যুবক ছাড়া আর কাউকে খুঁজে পেল না?
আবু জেহেলের কথায় কারও কিছু যায় আসে না। বর-কনে দুই পক্ষের আলোচনা সাপেক্ষে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেল। বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো খাদিজার বাড়িতে। বরপক্ষ থেকে মুহাম্মদের চাচা আবু তালিব ছাড়াও চাচা হামজা, আব্বাস এবং প্রাণপ্রিয় বন্ধু আবু বকর উপস্থিত হলেন। খাদিজার পক্ষ থেকে তাঁর পিতৃব্য উমর ইবনে আসাদ, ভাই আমর ইবনে খুয়াইলিন এবং বন্ধুসম চাচাতো ভাই ওয়ারাকা উপস্থিত হয়ে বিয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজনকে মহিমান্বিত করলেন।
আরবের রীতি অনুযায়ী বিয়ের অনুষ্ঠানে বর-কনে উভয়ের একজন করে অভিভাবক নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। অভিভাবকদ্বয় নিজেদের বক্তব্য পেশ করার পর আনুষ্ঠানিকভাবে বর-কনেকে পরস্পরের জীবনসঙ্গী হিসেবে ঘোষণা করেন এবং কনেকে বরের হাতে সোপর্দ করে দেন। রীতি অনুযায়ী বরপক্ষের অভিভাবক হিসেবে মুহাম্মদের চাচা আবু তালিব উঠে দাঁড়ালেন। তিনি তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন, 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের ইবরাহিম ও ইসমাইল (আ.)-এর ঔরসে সৃষ্টি করেছেন।
তিনিই সেইসত্তা, যিনি আমাদের এ জাতির নেতা বানিয়েছেন এবং পবিত্র ঘরের সেবা করার মধ্য দিয়ে আমাদের মানবতার সেবায় নিয়োজিত রেখেছেন।"
ভূমিকার পর তিনি তাঁর ভাতিজার প্রশংসাবাক্য পাঠ করলেন, 'যখন আমার ভাই আবদুল্লাহর ছেলে মুহাম্মদের প্রসঙ্গ আসে, তখন স্বভাবতই তার সমকক্ষ কাউকে পাওয়া যাবে না। অর্থ-সম্পদের দিক থেকে যদিও সে নিঃস্বপ্রায়, কিন্তু তাঁর সততা, নিষ্ঠা, বিশ্বস্ততা, সাহসিকতা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা সবার চেয়ে উন্নত। সম্পদ-বিত্ত একদিন শেষ হয়ে যাবে। এগুলো ক্ষণিকের উপকরণ মাত্র, মানুষকে ধোঁকায় ফেলে রাখে। সুতরাং, এখন আমি আপনাদের যে সংবাদ শোনাতে চাই, তা তার প্রতি আপনাদের ভালোবাসা আরও বাড়িয়ে দেবে। তিনি আপনাদের কন্যা খাদিজাকে বিয়ে করতে আগ্রহী। বিয়ের দেনমোহর হিসেবে ৫০০ দিরহাম ধার্য করা হলো। দেনমোহরের অর্ধেক বিয়ের আগে পরিশোধ করা হবে এবং বাকি অংশ বিয়ের পর পরিশোধ করা হবে।
[২]
আবু তালিব এটুকু বলে বসে পড়লেন। এবার কনেপক্ষের অভিভাবকের বলার পালা। খাদিজার পিতা খুয়াইলিদ ইবনে আসাদ বেশ আগেই ফিজার
যুদ্ধের সময় পরলোকগমন করেন। মুহাম্মদের মতো খাদিজাও এতিম। তাঁর সার্বিক অভিভাবকত্ব তাই তাঁর চাচা উমর ইবনে আসাদের হাতে সোপর্দ চাচা
উমর ইবনে আসাদ এবার উঠে দাঁড়ালেন।
সমবেত গণ্যমান্য ব্যক্তিদের দিকে তাকিয়ে বক্তব্য শুরু করলেন, 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন। আমাদের আরবের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরিয়েছেন, যেমনটি আপনি বলছিলেন। আমরা আরবের মধ্যে ভেজোদীপ্ত গোত্র। আপনারাও তাই। কেউই আপনাদের শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকার করতে পারবে না। সুতরাং, হে কুরাইশ বংশের সম্মানিত উপস্থিতি। আপনাদের সাক্ষী রেখে সেই সম্মানিত সত্তার নামে আমি খুয়াইলিদের কন্যা খাদিজাকে আবদুল্লাহর ছেলে মুহাম্মদের হাতে তুলে দিলাম এবং দেনমোহর হিসেবে প্রস্তাবিত পরিমাণ কবুল করে নিলাম।
দুই অভিভাবকের বক্তব্যকে উপস্থিত অতিথিরা স্বাগত জানালেন। তবে আবু তালিব এমন বরকতময় বিয়েতে তাঁর ভাইদেরও শামিল করতে চাইলেন।
তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত তাঁর ভাইদের উদ্দেশ করে বললেন, 'মুহাম্মদের চাচারাও এ বিয়েতে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করুক। তাঁর কথায় চাচারা একে একে দাঁড়িয়ে বললেন, 'হে কুরাইশ সম্প্রদায়। মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ এবং খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদের বিয়েতে আমিও একজন সাক্ষী হলাম।' বিয়ের আনুষ্ঠানিক কার্যাদি সম্পন্ন হলো। এবার বিয়ের ওলিমা ও উৎসবের পালা। খাদিজা কোনো কিছুর কমতি রাখেননি। আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য উট ও দুম্বা জবাই করা হয়েছে। মক্কার গণ্যমান্য অনেককেই দাওয়াত করা হয়েছে বিয়েতে।
[৩]
নানা পদের সুস্বাদু খাবার পরিবেশন করা হলো সবাইকে। মক্কার ছোট ছোট বাচ্চারা দফ ও তাম্বুরি বাজিয়ে নেচে-গেয়ে উৎফুলতা প্রকাশ করছিল। আরবের গোত্রীয় সংগীত গাইছিল মেয়েরা। সারা দিন উৎসবে রঙিন হয়ে রইল খাদিজার বাড়িটি।
তবে এত আনন্দ-উৎসবের মাঝেও খাদিজা স্বামী মুহাম্মদের উপস্থিতির ব্যাপারে সামান্য ঔৎসুক্য হারাননি। সবকিছুর বাইরে একটা চোখ তিনি সব সময় মুহাম্মদের দেখভালের ওপর রেখে দিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, মুহাম্মদের স্বজন সম্বন্ধীয় যাঁকে যাঁকে পেয়েছেন, তাঁকেই দাওয়াত করে নিয়ে এসেছেন বিয়ে উৎসবে। এমনকি মুহাম্মদের দুধমাতা হালিমা সাদিয়াকেও দাওয়াত করে নিয়ে আসতে ভুল করেননি।
খাদিজা ভোলেননি, এই হালিমার দুধপান করে মুহাম্মদ বড় হয়েছেন। তাঁর শৈশবের পাঁচটি বছর কেটেছে হালিমার কোলে। মুহাম্মদকে ভালোবাসার
প্রতিদানস্বরূপ তিনি হালিমাকে ৪০টি ভেড়া উপহার দিলেন এবং মুহাম্মদকে প্রতিপালন করার জন্য তাঁর কৃতজ্ঞতা আপন করলেন। বিদায়বেলায় সম্মানার্থে
খাদিজা হালিমাকে বেশ খানিকটা পথ এগিয়ে দিয়ে এলেন। খাদিজা ভুলে যাননি বারাকাহকেও, যিনি উম্মে আয়মান নামেই প্রসিদ্ধ। উম্মে আয়মান ছিলেন মুহাম্মদের পিতা আবদুল্লাহর ক্রীতদাসী। ক্রীতদাসী হলেও মুহাম্মদের পালকমাতা হিসেবে খাদিজা তাঁকে পরম মমতায় নিজের পরিবারভুক্ত করে নেন।
উম্মে আয়মানের জীবনকাহিনি একদিকে যেমন বেদনাবিধুর, তেমনি ঈর্ষণীয়। উম্মে আয়মানের বাড়ি ছিল ইথিওপিয়ায়, সেখান থেকে দুর্ভাগ্যক্রমে দাসী হিসেবে বিক্রি হয়ে যান দাসবাজারে। আবদুল্লাহ সদয় হয়ে তাঁকে নিজের ক্রীতদাসী হিসেবে কিনে আনেন। উম্মে আয়মান এ সময় নিতান্ত বালিকা।
উম্মে আয়মানকে কিনে আনার দুই সপ্তাহ পর আবদুল্লাহ বিয়ে করেন ইয়াসরিব নিবাসী আবদুল ওয়াহাবের কন্যা আমিনাকে। বিয়ের পর তিনি
ক্রীতদাসী উম্মে আয়মানকে নববধূ আমিনার হাতে তুলে দেন। চমৎকার একটি জুটি এবং দারুণ প্রেমময় ছিল তাঁদের নতুন সংসার। কিন্তু অচিরেই এ সংসারে নেমে আসে বেদনার রাশি রাশি কালো মখমল। উম্মে আয়মান নিজেই বর্ণনা করেন, "বিয়ের দুই সপ্তাহ পর আবদুল্লাহর পিতা আবদুল মুত্তালিব ছেলের ঘরে এসে তাঁকে ব্যবসা উপলক্ষে সত্ত্বর দামেস্ক অভিমুখী কাফেলার সঙ্গী হতে বলেন।'
[৪]
আবদুল্লাহ তাঁর পিতার একান্ত বাধ্যগত সন্তান। তাঁর পক্ষে পিতার কথার অবাধ্য হওয়া সম্ভব নয়। তিনি ব্যবসাযাত্রার জন্য প্রস্তুত হতে লাগলেন। কিন্তু নবপরিণীতা আমিনা এটা কিছুতেই মানতে পারলেন না। উম্মে আয়মান বলেন, পিতা আবদুল মুত্তালিবের এমন আদেশ শুনে আমিনা কেঁদে ওঠেন এবং বলতে থাকেন, 'কী আশ্চর্য, এমন হবে কেন? আমার স্বামী কীভাবে আমাকে রেখে ব্যবসার জন্য সিরিয়া যেতে পারে? আমি এখনো নতুন বধূ, আমার হাতের মেহেদি পর্যন্ত শুকায়নি। কিন্তু আবদুল্লাহকে যেতেই হবে। এটা তাদের পারিবারিক মৌসুমী ব্যবসা। আবদুল্লাহর বাণিজ্যযাত্রা আমিনার হৃদয়টা ভেঙে চুরমার করে দেয়। তিনি কাঁদতে কাঁদতে ঘরের মেঝেতে লুটিয়ে পড়তেন। উম্মে আয়মান বলেন, আমি যখন আমিনাকে এমন অবস্থায় বিরহে কাতর দেখতাম, তাঁর কাছে গিয়ে বলতাম, “হে আমার মালিকা!” আমিনা বেদনাহত চোখ তুলে আমার দিকে তাকাতেন। কান্নার গোঙানি নিয়ে আমাকে বলতেন, বারাকাহ, আমাকে বিছানায় নিয়ে যাও। আমি আর পারছি না।'
৮ম পর্ব পড়ুন: 👉 এখানে ক্লিক করুন

No comments