উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রদিয়াল্লাহু আনহা এর জীবনী ৮ম পর্ব | Mother of the believers Khadija (RA)

 


হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রদিয়াল্লাহু আনহা 

[১]

বালিকা উম্মে আয়মান এ সময় নবপরিণীতা আমিনার সর্বসঙ্গী হয়ে ওঠেন। বিষণ্ণতায় বিহ্বল আমিনা অধিকাংশ সময় নিজের ঘরে একাকী থাকতেন। কারও সঙ্গে দেখা করতেন না, কথা বলতেন না। একমাত্র আবদুল মুত্তালিব এলে কেবল তাঁর সঙ্গে কথা বলতেন। উম্মে আয়মান বলেন, 'আবদুল্লাহর দামেস্ক যাত্রার দুই মাস পর এক বিমুগ্ধকর সকালে আমিনা আমাকে ডেকে বললেন, 'বারাকাহ, আমি তো এক আশ্চর্য স্বপ্ন দেখেছি।'

আমি বললাম, 'নিশ্চয় ভালো কিছু, আমার মালিকা আমিনা বললেন, আমি দেখলাম, আমার গর্ভ থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে অলৌকিক আলো। সে আলো মক্কার চারপাশের পাহাড়, জনপদ ও মরুভূমিকে আলোকিত করে তুলছে। আমি হয়রান হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'আপনি কি গর্ভবর্তী মালিকা?'

তিনি লজ্জারাঙা হয়ে বললেন, 'হ্যাঁ, বারাকাহ। কিন্তু আমি তেমন কোনো অস্বস্তি অনুভব করছি না, যেমনটি অন্য গর্ভবতী মায়েরা করে থাকে।'

আমি তাকে আশ্বস্ত করে বললাম, আপনি এক বরকতময় শিশুর জন্ম দেবেন, যে আলোকিত করবে সমাজকে।' আবদুল্লাহর বিরহে আমিনা কাতর। গর্ভকালীন এ সময়টাতেও তিনি নিজেকে অন্য সবার কাছ থেকে গুটিয়ে রাখতেন। উম্মে আয়মান কথার
ফুলঝুরি এবং নানা ধরনের হাস্যাত্মক গল্প-কবিতা শুনিয়ে চেষ্টা করতেন তাঁর মালিকাকে উৎফুল্ল রাখতে। এরই মধ্যে একদিন হন্তদন্ত হয়ে আবদুল মুত্তালিব এলেন আমিনার ঘরে। জানালেন, এখনই তাঁকে মক্কার পাশের পাহাড়চূড়ায় আশ্রয় নিতে হবে। আবরাহা নামে ইয়েমেনের এক বাদশাহ তার বিশাল হস্তীবাহিনী নিয়ে মক্কা আক্রমণের জন্য এগিয়ে আসছে। সে আল্লাহর ঘর কাবাকে ধূলিসাৎ করার অভিপ্রায় নিয়ে আসছে। মক্কার কাউকে সে ছাড়বে না। নিরাপত্তার জন্য মক্কার সবাই পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে।

[২]
আমিনা শ্বশুরের কথায় বিন্দুমাত্র ভীত হলেন না। তিনি স্পষ্ট বলে দিলেন, স্বামীর ঘর ছেড়ে তিনি কোথাও যাবেন না। আর আল্লাহর ঘর কাবাকে
ধূলিসাৎ করার ক্ষমতা আবরাহার নেই। আবদুল মুত্তালিব আমিনার চেহারায় এমন আত্মবিশ্বাসের ছায়া দেখে বিচলিত হয়ে পড়লেন। অগত্যা তিনি তাঁকে মক্কায় রেখেই অন্যান্য মক্কাবাসীকে নিয়ে পার্শ্ববর্তী পাহাড়ের আশ্রয়ে চলে গেলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমিনার কথাই সত্য হলো, আবরাহার সেনা ও হস্তীবাহিনী ক্ষুদ্র পাখির ঝাঁকের ছুড়ে দেওয়া প্রস্তারাঘাতে কর্তৃত তৃণের মতো মক্কার উপকণ্ঠে মরে পড়ে রইল।

দিন-রাতের পুরোটা সময় উম্মে আয়মান আমিনার পাশেই থাকতেন। তিনি বলেন, 'আমি তাঁর পায়ের কাছে ঘুমোতাম এবং তিনি যখন ঘুমঘোরে দূরপ্রবাসী স্বামীর নাম ধরে ডাকতেন, আমি সহজেই শুনতে পেতাম। তাঁর গোঙানিতে অনেক সময় আমার ঘুম ভেঙে যেত। আমি তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করতাম।" কিছুদিন পর দামেস্কের অগ্রবর্তী বাণিজ্য কাফেলা ফিরে এল। আবদুল্লাহ এসেছেন কি না এটা জানতে বালিকা উম্মে আয়মান গোপনে আবদুল মুত্তালিবের বাড়ির ভেতরে গিয়ে কান পাতলেন। কিন্তু সেখানে আবদুল্লাহর ফিরে আসার কোনো সংবাদ পেলেন না। তিনি ফিরে এলেন, তবে আমিনার দুশ্চিন্তার ভয়ে তিনি তাঁকে এ ব্যাপারে কিছুই জানালেন না।

একসময় পুরো কাফেলাই মক্কায় ফিরে এল, কিন্তু আবদুল্লাহ এলেন না। স্বামীর প্রতীক্ষায় প্রতীক্ষমাণ আমিনার অস্থিরতা উম্মে আয়মানকে বারবার দংশন করছিল। তিনি আবার গেলেন আবদুল মুত্তালিবের বাড়িতে। এবার তিনি শুনতে পেলেন এমন এক সংবাদ, যার জন্য তিনি তো বটেই, মক্কার কেউ প্রস্তুত ছিল না। শুনলেন, মক্কায় ফেরার পথে আবদুল্লাহ মদিনার কাছাকাছি এসে পথিমধ্যে রোগে ভুগে মারা গেছেন। উম্মে আয়মান বলেন, 'এ সংবাদ শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমি শঙ্কিত হয়ে পড়লাম। আমি ভাবতে পারলামনা আমিনাকে এ সংবাদ আমি কীভাবে দেব-আবদুল্লাহ আর কখনো ফিরে আসবেন না প্রিয়তমার বুকে। যাঁর জন্য মক্কার এক কুটিরে প্রতীক্ষমাণ তাঁর প্রিয়তমা ও অনাগত সন্তান। যিনি সৌন্দর্যের কারণে বরিত হতেন কুরাইশদের অহংকার বলে; তিনি আর কখনো ফিরে আসবেন না।
[৩]
আমিনা যখন এ সংবাদ শুনলেন, চিত্কার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। জীবন-মৃত্যুর এ সন্ধিক্ষণে আমি তাঁর পাশেই ছিলাম, ঘরে আমি ছাড়া আর কেউ ছিল না। আমি তাঁর শুশ্রূষায় লেগে গেলাম। সেই দিনগুলোতে আমিই হয়ে উঠেছিলাম তাঁর বান্ধবী, তাঁর অভিভাবক, তাঁর চিকিৎসকও। সেদিন পর্যন্ত যেদিন মুহাম্মদ বেহেশত থেকে সিরাজাম মুনিরের আলো নিয়ে ধূলির ধরায় জন্ম নিয়েছিলেন আমিনার কোলে।

মুহাম্মদ ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর সর্বপ্রথম তাঁকে বুকে জড়িয়ে নিলেন বারাকাহ, উম্মে আয়মান। একটু পর তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব এসে নাতিকে কোলে করে নিয়ে গেলেন কাবাচত্বরে। সেখানে তিনি সকল মক্কাবাসীকে নিয়ে নতুন শিশুর আগমনে উৎসব পালন করলেন। মুহাম্মদ তখনো উম্মে আয়মানের কোলে ছিলেন, যখন হালিমা সাদিয়া তাঁর মাতৃত্ব গ্রহণ করে তাঁকে মক্কার বাইরে ঊষর স্বাধীন মরুর তাঁবু-জীবনে নিয়ে যান।

পাঁচ বছর পর যখন মুহাম্মদ ফিরে আসেন আমিনার কোলে, তখন আমিনার সঙ্গে উম্মে আয়মানও তাঁকে বুকে জড়িয়ে নেন। মুহাম্মদের বয়স যখন ছয় বছর, তখন আমিনা তাঁর শিশুসন্তানকে নিয়ে ইয়াসরিবে স্বামীর কবর জিয়ারতের আগ্রহ প্রকাশ করেন। আবদুল মুত্তালিব এবং উম্মে আয়মান যদিও তাঁকে সেখানে যেতে নিষেধ করেন কিন্তু আমিনা তাঁর সিদ্ধান্তে অটল রইলেন।

একদিন সকালবেলা আমিনা, উম্মে আয়মান এবং শিশু মুহাম্মদ সিরিয়াগামী এক কাফেলার সঙ্গে ইয়াসরিবের পথে যাত্রা করলেন। একই উটের হাওদায় চড়ে তাঁরা তিনজন চললেন ইয়াসরিবের পথে।

[৪]
১০ দিনের সফর শেষে তাঁরা ইয়াসরিবে পৌঁছালেন। আমিনা পুত্র মুহাম্মদকে তাঁর মামাদের কাছে রেখে স্বামীর সমাধি জিয়ারত করতে গেলেন। ভালোবাসা আর বেদনার নোনাজলে ভিজিয়ে দিলেন প্রিয়তম আবদুল্লাহর কবরের শুভ মাটি। ইয়াসরিবে কয়েক সপ্তাহ অবস্থানকালে প্রায় দিনই তিনি স্বামীর কবরের পাশে বসে অঝোরে কাঁদতেন।

ইয়াসরিবে কয়েক সপ্তাহ অবস্থান করে আমিনা মক্কায় ফেরার সফর শুরু করলেন। ইয়াসরিব থেকে মক্কার পথে রওনা হয়ে আবওয়া নামক স্থানে আসার পর আমিনা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং তাঁর অসুস্থতা দ্রুত অবনতির দিকে যেতে লাগল। তাঁর শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছিল, ঠিকমতো কথা বলতে পারছিলেন না। তাঁর অসুস্থতার দরুন তিন সদস্যের এ কাফেলা সেখানেই যাত্রাবিরতি করতে বাধ্য হলো।

এ সময় আমিনা উম্মে আয়মানকে নিজের কাছে ডাকলেন। উম্মে আয়মান বর্ণনা করেন, 'আমিনা আমাকে ডেকে বললেন, 'বারাকাহ, শোনো। আমার জীবনের মঞ্জিল হয়তো শেষ হয়ে এসেছে। জীবন থেকে আমারও হয়ে গেছে সময়, বিদায় নেওয়ার। আমার বুকের ধন মুহাম্মদকে তোমার বুকে রেখে গেলাম। আজ থেকে তুমি তার মা, তুমিই তার সব। সে যখন আমার গর্ভে ছিল, তখন হারিয়েছে পিতাকে। এখন চোখের সামনে নিজের মাকেও চলে যেতে দেখছে। তুমি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এতিম মুহাম্মদের মা হয়ে থেকো। কখনো তাকে ছেড়ে যেয়ো না। আলবিদা।' আমিনা, মুহাম্মদের মা আমিনা। নিজ শহর মক্কা থেকে বহুদূরে, বাবার বাড়ি ইয়াসরিব থেকে অনেক দূরে আবওয়ার এক জনশূন্য মরু বিয়াবানে জীবনের শেষ সফরের পাট চুকিয়ে বিদায় নিলেন পৃথিবী থেকে। প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে পরমপ্রিয় স্বামী আবদুল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেলেন বড় অবেলায়।

মা হারিয়ে ছয় বছরের বালক মুহাম্মদ কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়লেন তাঁবুর নিচে। ক্রীতদাসী উম্মে আয়মান নিজ হাতে কবর খুঁড়লেন আমিনার জন্য। কোথাও কেউ নেই। উম্মে আয়মান নিজেই কবরে শোয়ালেন তাঁর মালকিনকে। তাঁর হৃদয়ে রক্ষিত সবটুকু ভালোবাসা মাটিচাপা দিলেন বুকে পাথর বেঁধে। জনমানবহীন আবওয়ার প্রান্তরে অবিরত কান্নাঝরা চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে অলৌকিক প্রভুর কাছে আরতি করলেন, 'তোমার আমিনাকে তোমার কাছেই রেখে গেলাম, হে অবিনশ্বর।" চিৎকার করে কাঁদতে থাকা ছোট্ট মুহাম্মদকে বুকের পাঁজরে জড়িয়ে উম্মে আয়মান অবিন্যস্ত পায়ে হাঁটতে লাগলেন মক্কার পথে।
[৫]
না, বারাকাহ কখনো মুহাম্মদকে ছেড়ে যাননি। ছোট্ট শিশুটি থেকে তাঁকে বুকের অপার ভালোবাসা দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন তিলতিল করে। মায়ের মমতার চাদরে জড়িয়ে রেখেছিলেন জীবনভর। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। আমিনাকে দেওয়া তাঁর কথার বিন্দুমাত্র বরখেলাপ করেননি তিনি। বারাকাহ, উম্মে আয়মান। মুহাম্মদের মা। উম্মে আয়মান সদ্য মা হারানো এতিম বালক মুহাম্মদকে বুকে আগলে মক্কায় চলে এলেন। তাঁকে অর্পণ করলেন তাঁর দাদার কাছে। তিনি নিজেও রয়ে গেলেন মুহাম্মদের মা হয়ে। দুই বছর পর আবদুল মুত্তালিবও মুহাম্মদকে একাকী করে দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন। চাচা আবু তালিব বুকে টেনে নিলেন ভাতিজাকে। উম্মে আয়মান তাঁর সঙ্গেই রইলেন। বালক মুহাম্মদকে ভালোবাসার আঁচল দিয়ে ঢেকে রাখলেন। তাঁকে বালক থেকে কিশোর, কিশোর থেকে গড়ে তুললেন পরিপূর্ণ এক যুবকে।

মুহাম্মদ যখন খাদিজাকে বিয়ে করেন, বিয়ে উপলক্ষে মুহাম্মদ তাঁর মা সমতুল্য এই ক্রীতদাসীকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করে স্বাধীন করে দিলেন। উম্মে আয়মান স্বাধীন হওয়ার পরও মুহাম্মদকে ছেড়ে গেলেন না। মুহাম্মদের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, 'আমি কখনো তাকে ছেড়ে যাব না, সে-ও কখনো আমাকে ছেড়ে থাকবে না।' মুহাম্মদ বড় ভালোবাসতেন তাঁর এ মাকে। বড় সম্মান করতেন উম্মে আয়মানকে। বিয়ের পর একদিন মুহাম্মদ উম্মে আয়মানকে ডেকে বললেন, ও মা (তিনি সব সময় তাঁকে মা বলে ডাকতেন), এখন তো আমি বিয়ে করে
ফেললাম, কিন্তু তুমি তো এখনো অবিবাহিতা। কেউ যদি এখন তোমাকে বিয়ে করতে চায়, তাহলে তোমার কী মতামত?

৯ম পর্ব পড়ুন: 👉 এখানে ক্লিক করুন


No comments

Powered by Blogger.