উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রদিয়াল্লাহু আনহা এর জীবনী ৯ম পর্ব | Mother of the believers Khadija (RA)
হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রদিয়াল্লাহু আনহা
[১]
উম্মে আয়মান মুহাম্মদের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি কখনোই তোমাকে ছেড়ে যেতে পারব না। কোনো মা কি তার সন্তানকে ছেড়ে থাকতে পারে?"
মুহাম্মদ অশ্রুভেজা চোখে হাসলেন এবং চুমু খেলেন তাঁর মাথায়। এরপর তিনি সদ্যপরিণীতা খাদিজার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'এ হচ্ছে বারাকাহ। আমার মায়ের মৃত্যুর পর সে-ই আমার মা হিসেবে আমাকে বড় করেছে। সে-ই আমার পরিবারের একমাত্র সদস্য। খাদিজা ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকালেন উম্মে আয়মানের দিকে। তাঁকে কাছে টেনে বললেন, 'বারাকাহ, মুহাম্মদের জন্য এত আত্মত্যাগ করেছে, যা তুলনাহীন। এখন মুহাম্মদ সে আত্মত্যাগের সামান্য কিছু বিনিময় তোমাকে ফিরিয়ে দিতে চাচ্ছেন। আমি এবং মুহাম্মদ দুজনই অনুরোধ করছি-বয়স পেরিয়ে যাওয়ার আগে বিয়েটা করে ফেলো।' উম্মে আয়মান লজ্জিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'কে আমাকে বিয়ে করবে?' খাদিজা বললেন, ইয়াসরিব থেকে উৰায়েদ ইবনে আয়েদ এসেছেন তোমার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। তিনি তোমাকে বিয়ে করতে চান। তাঁকে বিমুখ কোরো না।'
উম্মে আয়মান এ প্রস্তাব মেনে নিয়ে উবায়েদ ইবনে জায়েদকে বিয়ে করলেন। বিয়ের পর তিনি স্বামীর সঙ্গে ইয়াসরিবে চলে যান। কিছুদিন পর তিনি সেখানে এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেন, যার নাম রাখা হয় আয়মান। এ আয়মানের নামানুসারেই তাঁকে উম্মে আয়মান 'আয়মানের মা' বলে ডাকা হতো।
উম্মে আয়মানের এ স্বামী-সংসার বেশি দিন স্থায়ী হলো না। পুত্র আয়মানের জন্মের কিছুদিন পর তাঁর স্বামী উবায়েদ ইবনে আয়েন মৃত্যুবরণ করেন এবং তিনি পুনরায় মক্কায় তাঁর ছেলে মুহাম্মদের কাছে চলে আসেন। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম যখন নবুওয়াতপ্রাপ্ত হন, তখন উম্মে আয়মান ইসলাম গ্রহণ করে প্রথম সারির মুসলিম হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। ইসলামের জন্য তিনি অনেক কষ্ট সহ্য করেন। নবুওয়াতের কাজে নানাভাবে তিনি রাসুল মুহাম্মদকে সাহায্য করতেন। বিশেষত, মক্কার পৌত্তলিকেরা কোথাও কোনো মুসলিমকে নির্যাতন করলে বা রাসুলের বিরুদ্ধে
কোনো ষড়যন্ত্র করলে তিনি এবং জায়েদ ইবনে হারিসা সেসব সংবাদ সংগ্রহ করে রাসুলকে জানাতেন।
নবুওয়াতের প্রথম দিকে এক রাতে মক্কার পৌরনিকেরা দারুল আরকামের চারপাশ ঘিরে ফেলে, যেখানে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবিদের নিয়ে পরামর্শ করছিলেন এবং তাদের ইসলামের বিষয়াবলি শিক্ষা
দিচ্ছিলেন। এ সময় রাসুলের স্ত্রী খাদিজা জরুরি একটা সংবাদ দিয়ে উম্মে আয়মানকে রাসুলের কাছে পাঠান। তিনি বহু কষ্টে পৌত্তলিকদের চোখ ফাঁকি দিয়ে দারুল আরকামে গিয়ে রাসুলের কাছে খাদিজার সংবাদটি পৌঁছান।
[২]
তাঁর কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদটি শুনে রাসুল অত্যন্ত খুশি হন এবং বলে ওঠেন, 'তোমার আগমন শুভ হোক। এর বিনিময়ে তোমার জন্য বেহেশতে একটি প্রাসাদ পাওনা রইল। উম্মে আয়মান খুশি হলেন। যখন তিনি দারুল আরকাম থেকে চলে এলেন, তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম
উপস্থিত সাহাবিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, যদি তোমরা কেউ বেহেশতি কোনো রমণীকে বিয়ে করতে চাও, তবে সে যেন উম্মে আয়মানকে বিয়ে করে। উম্মে আয়মানের বয়স তখন পঞ্চাশের কাছাকাছি। তিনি তেমন সুন্দরীও ছিলেন না এবং আকর্ষণীয়ও নন। রাসুলের পালক পুত্র জায়েদ ইবনে হারিসা দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল! আমি উম্মে আয়মানকে বিয়ে করতে চাই। তিনি রূপবতী অনেক রমণীর চেয়েও উত্তম।"
জায়েদ এবং উম্মে আয়মানের বিয়ে হয়ে গেল। কিছুদিন পর তাঁদের ঘর আলো করে এল এক পুত্রসন্তান। তার নাম রাখা হলো উসামা। রাসুল সাল্লাল্লাহ আলায়হি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত স্নেহ করতেন উসামাকে। তিনি তাকে কোলে নিয়ে ঘুরতেন, তার সঙ্গে খেলা করতেন, নিজ হাতে খাওয়াতেন। রাসুলের সাহাবিরা বলতেন, সে ভালোবাসায় পরিপূর্ণ এক শিশু।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন, তখন উম্মে আয়মানকে মক্কায় রেখে যান। কেননা রাসুলের বাড়িতে তখন তাঁর মেয়ে ও পরিবারের অন্য সদস্যরা অবস্থান করছিলেন। তাঁদের দেখাশোনার জন্য উম্মে আয়মান মক্কায় রয়ে যান। হিজরতের তিন মাস পর তাঁদের নেওয়ার জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম জায়েদ ইবনে হারিসা এবং ক্রীতদাস আবু রাফেকে পাঠান। উম্মে আয়মান রাসুলের দুই কন্যা উম্মে কুলসুম ও ফাতেমা, আবু বকরের পরিবার এবং নিজের সন্তান উসামাকে নিয়ে মদিনার পথে যাত্রা করেন।
যাত্রাপথে বাহনের স্বল্পতার কারণে উম্মে আয়মান দীর্ঘ পথ হেঁটে পাড়ি দেন। মরুভূমির তপ্ত বালিয়াড়ি পাড়ি দেওয়ার ফলে তাঁর পায়ে ফোসকা পড়ে যায়। গনগনে রোদের নিচে হাঁটার ফলে তাঁর চামড়া পুড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। দীর্ঘ যাত্রার পর যখন তিনি মদিনায় পৌঁছান, তখন তাঁর পা ছিল ক্ষত বিক্ষত, তাঁর শরীরজুড়ে ধুলো-বালি, মুখাবয়ব হয়ে গিয়েছিল রৌদ্রতামাটে। তাঁকে এ অবস্থায় দেখে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম দৌড়ে আসেন তাঁর কাছে। তাঁর পাশে বসে বলতে থাকেন, 'ও উম্মে আয়মান, ও আমার মা। তোমার প্রতিদান তো কেবল বেহেশত ছাড়া আর কিছু নয়।
[৩]
রাসুল পরম মমতায় উম্মে আয়মানের মুখ ও চোখ থেকে সকল ক্লান্তি মুছে দেওয়ার চেষ্টা করেন। নিজ হাতে তাঁর ক্ষত-বিক্ষত পা মালিশ করে দেন, দীর্ঘ সময় তাঁর শুশ্রূষা করতে থাকেন।
মদিনায় উম্মে আয়মান নতুন করে তাঁর সংসার শুরু করলেন। এ সময় ইসলামের জন্য নিজেকে আত্মনিবেদিত করে দেন। উহুদের যুদ্ধে শত্রুর ভিরবৃষ্টি উপেক্ষা করে তিনি মুসলিম যোদ্ধাদের পানি পান করান এবং আহতদের চিকিৎসা করেন। খায়বার ও হুনাইনের যুদ্ধেও তিনি রাসুলের সঙ্গে ছিলেন। তাঁর প্রথম ছেলে আয়মান হিজরতের অষ্টম বছরে হুনাইনের যুদ্ধে বীর বিক্রমে যুদ্ধ করে শহিদ হন। তাঁর দ্বিতীয় স্বামী, রাসুলের ভালোবাসার পালক পুত্র জায়েদ ইবনে হারিসা সিরিয়ায় মুতার যুদ্ধে সেনাপতি হিসেবে যুদ্ধ করে শহিদ হন। এ সময় উম্মে আয়মানের বয়স হয়েছিল সত্তরের কাছাকাছি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম প্রায়ই তাঁর দুই বন্ধু আবু বকর ও উমরকে নিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। তাকে জিজ্ঞেস করতেন, 'ও আমার মা, কেমন আছো তুমি?”
উত্তরে উম্মে আয়মান বলতেন, 'বেটা, আমি ভালো আছি। ইসলাম আমাকে অনেক দামি করেছে।
রাসুলের ইন্তেকালের পর তিনি প্রায়ই কাঁদতেন। কেউ তাঁকে জিজ্ঞেস করত, 'কেন আপনি কাঁদছেন?' তিনি বলতেন, 'আল্লাহর কসম! আমি জানতাম একদিন আল্লাহর রাসুল ইন্তেকাল করবেন। কিন্তু আমি এখন কাঁদছি কারণ, আরশ থেকে নেমে আসা ঐশীবাণী আমাদের জন্য রুদ্ধ হয়ে গেছে চিরদিনের জন্য।
বারাকাহ, উম্মে আয়মানই একমাত্র মানুষ, যিনি রাসুল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে তাঁর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সবচেয়ে কাছ থেকে দেখেছেন। তিনি তাঁর সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছিলেন রাসুলের ভালোবাসায়। রাসুল এবং ইসলামের জন্য তাঁর আত্মত্যাগ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে ইসলামের ইতিহাসে। এই মহীয়সী নারী হজরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের সময় ইন্তেকাল করেন।
১০ম পর্ব পড়ুন: 👉এইখানে ক্লিক করুন

No comments