উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রদিয়াল্লাহু আনহা এর জীবনী শেষ পর্ব | Mother of the believers Khadija (RA)


 হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রদিয়াল্লাহু আনহা

১০ বছর পর।

প্রিয়তমা খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার মৃত্যুর তিন বছর পর রাসুল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম রাতের আঁধারে মাতৃভূমি মক্কা থেকে হিজরত করে চলে গিয়েছিলেন ইয়াসরিবে হিজরতের সাত বছর পর আবার তিনি ফিরে এলেন মক্কায়। তবে এবার রাতের আঁধারে নয়, ফিরে এলেন সূর্যদিনের ঝলমলে রোদ্দুর হাতে নিয়ে। বিজয়ীর বেশে মাথা উঁচু করে। হিজরত করেছিলেন সঙ্গে কেবল আবু বকরকে নিয়ে, আজ ফিরে এসেছেন ১০ হাজার প্রদীপ্ত সেনানী নিয়ে। তিনি তাঁর সেনানীদের নিয়ে বীরদর্পে পা রাখলেন প্রিয় মাতৃভূমি মক্কার বালিয়াড়ি আঙিনায়। তিনি মক্কা শহরে প্রবেশ করলেন। তাঁর মক্কা আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে গেল। এক অর্থে এখন তিনি সমগ্র আরবের মুকুটহীন সম্রাট। যদিও তিনি সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য প্রেরিত হননি, তিনি পৃথিবীর বুকে আগমন করেছিলেন কেবলই মানবজাতির আলোকিত ভবিষ্যতের জন্য, কিন্তু তাঁর হেদায়েতের আলোকবিতায় মাথানত করেছে আরবের সকল বিস্তৃতি।

সকল সিংহাসন পদানত হয়েছে তাঁর চরণতলে শহরে প্রবেশ করে তিনি তাঁর অনুসারীদের নিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। শহরের এ-গলি ও-গলি ঘুরে এগিয়ে যেতে লাগলেন। তাঁর পেছনে সারিবদ্ধ সাহাবিরা তাঁকে অনুসরণ করছিলেন। তাঁদের মুখে ধ্বনিত হচ্ছিল বিজয়ের নাড়া। আল্লাহু আকবারের প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়ছিল মক্কার পৌত্তলিক ইয়ারে।

রাসুল এগিয়ে যাচ্ছিলেন সবার আগে আগে। তিনি কোথাও থামছেন না । রাসুলের পেছন পেছন আগত সাহাবি এবং মক্কার বিজিত অধিবাসীরা উৎসুক
হয়ে আছে মুহাম্মদ কোথায় যাচ্ছেন?

একসময় তিনি এসে থামলেন হাজুন নামক স্থানের জান্নাতুল মুয়াল্লা কবরগাহে। এখানেই শুয়ে আছেন তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজাতুল কুবরা। ২৫ বছরের দাম্পত্যজীবনের এক বেহেশতি বন্ধন চাপা পড়ে আছে এই জান্নাতুল মুখান্নার শুকনো মাটির তলে। প্রেম আর ভালোবাসার এক অতল আধার নিভৃতে ঘুমিয়ে আছে মুয়াল্লার নির্জন প্রান্তরে। ১০ বছর পর মক্কায় প্রবেশ করে তিনি সর্বপ্রথম হাজিরা দিতে এলেন তাঁর প্রিয়তমার কবরগাহে। খাদিজার সেই অতলান্ত প্রেম এখনও ধূপশিখার মতো নিরবধি জ্বলে আছে মুহাম্মদের মনমুকুরে। কী করে তুলবেন তিনি তার প্রথম প্রেম, প্রথম প্রিয়তমাকে! মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম প্রিয়তমার কবরের পাশে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখ অশ্রুসিক্ত। বোবাকান্নায় অশ্রুত হৃদয়ের আহাজারি। এত দিন পর, এতগুলো বছর পর আবার তিনি অশ্রুসজল হয়ে দাঁড়াতে পারলেন খাদিজার কবরের পাশে। দূর মদিনায় কত দিন তিনি খাদিজার বিরহে ব্যথিত হয়েছেন, কত দিন তিনি খাদিজার বেদনায় একা কেঁদেছেন, সে কথা তিনি আর আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না।

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম আজ ব্যথাতুর। খাদিজা তো সেই কবেই চলে গিয়েছেন। তারপর চলে গেছেন এক এক করে তিন কন্যাও রোকাইয়া, উম্মে কুলসুম, জয়নব। সবাই তাঁদের মায়ের সঙ্গে গিয়ে শরিক হয়েছেন। দুই ছেলে তো আগেই চলে গিয়েছিলেন। এখন কেবল ফাতেমা জীবিত আছেন। আজ এখানে দাঁড়িয়ে তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের ব্যথায় আবার মুষড়ে পড়লেন। তবু আজ তিনি খাদিজার পাশে এসে দাঁড়াতে পেরেছেন, ভালোবেসে অশ্রু বিগলিত হতে পেরেছেন। তিনি রবের শোকরিয়া জানালেন। আল্লাহর দরবারে হাত তুললেন। প্রিয়তমা খাদিজার জন্য দোয়া করলেন আল্লাহর কাছে। সকল সাহাবির কণ্ঠে বারবার ধ্বনিত হতে লাগল- আমিন, ইয়া রাব্বাল আলামিন

উম্মুল মুমিনিন আয়েশা বলতেন, 'আমি কখনো খাদিজাকে দেখিনি। না দেখার পরও তাঁকে যে পরিমাণ ঈর্ষা করতাম, রাসুলের আর কোনো স্ত্রীর প্রতি এতটা ঈর্ষা হতো না। রাসুল তাঁকে অনেক বেশি স্মরণ করতেন। কোনো অনুষ্ঠান উপলক্ষে যখনই কোনো বকরি জবাই হতো, তার কিছু অংশ সবার
আগে খাদিজার আত্মীয় ও বান্ধবীদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতেন।

পরবর্তী স্ত্রীদের মধ্যে আয়েশা ছিলেন রাসুলের সবচেয়ে প্রিয়তমা। সেই আয়েশা খাদিজার প্রতি রাসুলের ভালোবাসা দেখে ঈর্ষান্বিত হতেন। অনেক
সময় তো কিশোরী আয়েশা রাসুলের মুখে খাদিজার এত এত প্রশংসা শুনে গোম্বাও করে উঠতেন। একদিন মুখ ফসকে বলেই ফেললেন, 'কেন এই লাল
ঠোঁটওয়ালি মহিলাকে এত স্মরণ করতে হবে, যিনি বেশ কয়েক বছর আগেই পরলোকগমন করেছেন। মনে হয় তিনি ছাড়া পৃথিবীতে আর কোনো নারী
নেই!

আল্লাহ তো তাঁর পরিবর্তে আপনাকে আরও উত্তম নারী দান করেছেন!" এটা একদিকে যেমন আয়েশার ঈর্ষাকে প্রকাশ করেছে, তেমনি প্রকাশ করেছে খাদিজার প্রতি রাসুলের ভালোবাসা কতটা গভীর, সেটা পরিমাপ করার একটি গোপন অভীপ্সাও। আয়েশার মতো অনুসন্ধিৎসু শিক্ষানবিশের জন্য এটা জানা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আয়েশার কথায় আল্লাহর রাসুল ব্যথিত হলেন। তিনি আয়েশার সামনে তুলে ধরলেন খাদিজার অনন্যতা। যে অনন্যতার অতল স্পর্শ করতে পারেননি রাসুলের আর কোনো স্ত্রী। তিনি বেদনাহত কণ্ঠে স্পষ্ট ভাষায় বললেন, 'তার মতো আর কে হতে পারবে? না, তার চেয়ে উত্তম নারী আল্লাহ আমাকে দান করেননি। মক্কার মানুষেরা যখন আমার কথা মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, তখন সে সবার আগে আমার প্রতি ঈমান এনেছে। আমার নবুওয়াত নিয়ে মানুষ যখন আমাকে মিথ্যাবাদী বলেছিল, তখন সে আমার নবুওয়াতের সত্যায়ন করেছে। মানুষ যখন আমাকে বঞ্চনায় তাড়িয়ে দিয়েছিল, তখন সে আমাকে তার সম্পদ দিয়ে ভরসা দিয়েছে। আল্লাহ তার মাধ্যমে আমাকে সন্তান দান করেছেন। না, তার মতো আর কেউ নেই।' সত্যি, তাঁর মতো আর কেউ নেই। তিনি অনন্যা। তিনি তুলনাহীনা ।


এক নজরে

জন্ম: ৫৫৫ খ্রিষ্টাব্দ।

বিয়ে: বিয়ের সময় খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার বয়স ছিল ৪০ এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের বয়স ছিল ২৫।

বিবাহ সন: ৫৯৫ খ্রিষ্টাব্দ।

দাম্পত্যজীবন: রাসুলের সাথে তাঁর দাম্পত্যকাল ২৪ বছর ৬ মাস বা প্রায় ২৫ বছর। তিনি বেঁচে থাকা অবধি রাসুল দ্বিতীয় বিয়ে

করেননি। মৃত্যুসন: ৬২০ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল / মে মোতাবেক নবুওয়াতের দশম বর্ষের রমজান মাসের ১০ তারিখ। দাফন: মক্কার 'হাজুনে'; মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর।

আমাদের পরবর্তী সিরিজ গুলো পড়ুন

No comments

Powered by Blogger.