উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রদিয়াল্লাহু আনহা এর জীবনী ১৬তম পর্ব | Mother of the believers Khadija (RA)
হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রদিয়াল্লাহু আনহা
কুরাইশদের শত অত্যাচার সত্ত্বেও মক্কায় মুসলিমদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এরই মধ্যে ইসলাম গ্রহণ করলেন মক্কার অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব উমর ইবনে খাত্তাব। রাসুলের চাচা হামজাও সমসময়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। কুরাইশদের নানা রকম বাধা-বিঘ্নতা পাড়ি দিয়ে প্রায় ৯০ জন মুসলিম পার্শ্ববর্তী খ্রিষ্টান দেশ ইথিওপিয়ায় হিজরত করেছেন। কুরাইশরা তাঁদের ফিরিয়ে আনতে মক্কা থেকে প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছিল, কিন্তু প্রতিনিধিদল ব্যর্থ ও অপমানিত হয়ে ফিরে এসেছে। সব দিক থেকে মক্কার কুরাইশরা মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের প্রত্যয়দীপ্ত অগ্রযাত্রায় শঙ্কিত বোধ করতে লাগল।
এবার কুরাইশদের একতাবদ্ধ হওয়ার পালা। যেকোনোভাবেই হোক মুহাম্মদের নতুন ধর্মকে রুখতে হবে। আবু জেহেল, আবু লাহাব, আবু সুফিয়ান এবং মক্কার অন্যান্য গোত্রীয় নেতারা সিদ্ধান্তে উপনীত হলো মুহাম্মদ ও তাঁর ধর্মমত অনুসারী এবং তাঁকে অভয়াশ্রয় দেওয়া কুরাইশি হাশিম গোত্রকে মক্কার বাইরে নির্বাসন দেওয়া হবে। শিআবে আবু তালিব নামে মক্কা নগরীর বাইরে একটি গিরিপথ রয়েছে, গোত্রীয় পঞ্চায়েতে মুহাম্মদসহ তাঁর সকল অনুগামীকে সেখানে নির্বাসনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো।
ধর্ম রক্ষার জন্য মুহাম্মদ কুরাইশদের প্রস্তাব মেনে নিলেন। এ প্রস্তাব একটি চুক্তিনামা আকারে লিখে কাবাঘরের দেয়ালে টানিয়ে দেওয়া হলো। মুহাম্মদ তাঁর একান্ত অনুসারীদের নিয়ে মক্কা থেকে বের হয়ে আবু তালিব গিরিপথে চলে গেলেন। সেখানে তাঁবু টানিয়ে সবাইকে নিয়ে দুঃসহ এক জীবন শুরু করলেন। খাদিজার জন্য এ সময়টা ভীষণ দুর্বিষহ হয়ে দেখা দিল। এ সময় তাঁর শিশুপুত্র আবদুল্লাহ রোগে ভুগে মারা যান। মাত্রই হাঁটতে-চলতে শিখেছিলেন তিনি, তাঁর প্রয়াণে খাদিজা ভেঙে পড়লেন। বড় মেয়ে জয়নব স্বামী আবুল আসের সঙ্গে বসবাস করলেও আবুল আস তখন পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করেননি, এ নিয়ে খাদিজার মনে সব সময় দুশ্চিন্তা বিরাজ করত। দ্বিতীয় মেয়ে রোকাইয়া তাঁর স্বামী উসমান ইবনে আফফানের সঙ্গে সুদূর ইথিওপিয়ায় দেশান্তরি হয়েছেন, তাঁর জন্যও চিন্তার অন্ত ছিল না। ছোট দুই মেয়ে উম্মে কুলসুম ও ফাতেমাকে বুকে আগলে তিনি নির্বাসনের সাজা মাথা পেতে নিলেন।
স্বামী মুহাম্মদকে ভালোবেসে নির্বাসনের জীর্ণ তাঁবুই তাঁর জন্য সুরমা প্রাসাদতুল্য। তিনি ইচ্ছে করলে পারতেন নির্বাসনের আওতা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে। কেননা তিনি হাশিম গোত্রের আওতাভুক্ত ছিলেন না। তিনি কুরাইশের ভিন্ন গোত্রের লোক ছিলেন। ইচ্ছা করলে মক্কার নিরুপদ্রব বাসগৃহে নিজেকে নিরাপদ রাখতে পারতেন। কিন্তু তিনি বেছে নিলেন ধুলোর পৃথিবী। গিরিপথের কঠিন পাথরদেয়ালের মাঝে নিজেকে বন্দী করে রাখলেন মুহাম্মদের ভালোবাসার পিঞ্জিরায়। মুহাম্মদকে ভালোবাসার জন্যই তাঁর জন্ম, কীভাবে তিনি মুহাম্মদের থেকে জুদা হবেন? মুহাম্মদকে এক মুহূর্তের জন্যও নিজের চোখের আড়াল হতে দিতে চান না। মুহাম্মদের রক্ত আর তাঁর রক্তধারা একই স্রোতে মিশে লীন হয়ে গেছে, তাঁদের আর জুদা করার কোনো সুযোগ নেই। জন্ম-জন্মান্তরের জন্য একে অন্যের মাঝে বিলীন হয়ে গেছেন। তাঁদের প্রেম চিরঞ্জীব। তাঁদের ভালোবাসা অবিনশ্বর।
খাদিজার ব্যবসা আর আগের মতো নেই। ব্যবসায়িক সকল দায়দায়িত্ব আগেই তুলে দিয়েছেন ভাতিজা হাকিম ইবনে হিজামের হাতে। তিনি প্রায় নিঃস্ব হয়ে গিরিপথে মুহাম্মদের সঙ্গী হয়েছেন। নির্বাসনের চুক্তিপত্রের শর্ত অনুযায়ী নির্বাসিত লোকজন মক্কার কারও সঙ্গে কোনো ব্যবসায়িক কার্যাদি সম্পন্ন করতে পারবে না। এমনকি কোনো কেনাবেচা, লেনদেন, উপহার দানও তারা গ্রহণ করতে পারবে না। মক্কাবাসীর জন্যও একই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, তারাও নির্বাসিত কোনো ব্যক্তির কাছে কিছু বিক্রি করতে পারবে না বা তাদের থেকে কিছু কিনতে পারবে না।
নির্বাসিত মুসলিমদের মাঝে চরম মানবিক সংকট দেখা দিল। পর্যাপ্ত খাবার নেই, শিশুদের জন্য শিশুখাদ্যের ব্যবস্থা নেই, বসবাসের জন্য বাসস্থানের অপর্যাপ্ততা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সব মিলিয়ে গিরিপথের জীবন একপ্রকার মানবেতর জীবনে রূপ নিল। অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়াল সাহাবিরা ক্ষুধার যন্ত্রণায় গাছের বাকল পানিতে সেদ্ধ করে খাওয়া শুরু করলেন। কেউ কেউ উপত্যকা থেকে তুলে আনা ঘাস সেদ্ধ করে খেতে লাগলেন। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস একদিন এক খণ্ড চামড়া পেলেন, ক্ষুধার তাড়নায় সেটাই সেদ্ধ করে খাওয়া শুরু করলেন। অনাহারে-অর্ধাহারে স্তন্যদাত্রী মায়েদের বুক শুকিয়ে গেল। শিশুরা দুধের তৃষ্ণায় গলা ছেড়ে চিৎকার করতে লাগল। দূর থেকে কুরাইশনেতারা তাদের চিৎকার শুনে অট্টহাসি হাসত। সাহাবিদের মরণাপন্ন অবস্থা দেখে নির্লজ্জভাবে তাদের নিয়ে হাসি-তামাশা করত।
এত নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও অকুতোভয় খাদিজা দমলেন না। তিনি তাঁর ভাগনে হাকিম ইবনে হিজামের মাধ্যমে নির্বাসিত লোকজনের জন্য গোপনে খাদ্যদ্রব্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য আনার ব্যবস্থা করলেন। যদিও সে ত্রাণসামগ্রী ছিল অপ্রতুল এবং সব সময় কুরাইশদের চোখ ফাঁকি দিয়ে তা আনার ব্যবস্থাও ছিল দুঃসাধ্য, তবু তিনি নিজের সবটুকু উজাড় করে দিলেন মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীদের সেবায়।
নির্বাসনের পীড়নে দিন দিন খাদিজার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়তে লাগল। তাঁর বয়স তখন পঁয়ষটি। জীবনগাঙের স্রোতে লেগেছে ভাটার টান। দীর্ঘদিনের নির্বাসনে তাঁর শরীরে নানা প্রকার রোগ বাসা বাঁধতে থাকে। অনাহার অর্ধাহারের ফলে শারীরিক শক্তি নিঃশেষ প্রায়। জীর্ণতা জেঁকে ধরেছে অঙ্গপ্রত্যঙ্গে। তবু স্বামী মুহাম্মদকে একটুখানি ভালো রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যেতে লাগলেন। রোগ-জর্জরিত বুকের ক্ষয়িষ্ণু আওয়াজটুকু দিয়েও প্রার্থনা করতেন মুহাম্মদের সর্বাঙ্গীণ সফলতার। মুহাম্মদের মুখের একচিলতে হাসি প্রবল অসুস্থতার মাঝেও তাঁকে দিত বেহেশতি সৌরভ। তাঁর শয্যাপাশে মুহাম্মদ যখন বসে থাকেন, মনে হয় এর চেয়ে বড় সুখ পৃথিবীতে কিছু নেই আর। মুহাম্মদের মুখের দিকে তাকালে এখনো তাঁর চোখে ভেসে ওঠে দামেস্কের বাজার থেকে ফেরা যুবক মুহাম্মদের সেই যৌবনদীপ্ত ছায়াছবি। খাদিজার চোখ জলে ভরে ওঠে।
নির্বাসনের মেয়াদ রইল প্রায় তিন বছর। তিন বছর পর কাবার ৬০ রক্ষকেরা একদিন কাবার মাঝে গিয়ে দেখে কাবার দেয়ালে লটকে দেয়া নির্বাসনের চুক্তিনামা উইপোকায় খেয়ে তছনছ করে ফেলেছে। লিখিত ধারাগুলো আর পাঠ করা যাচ্ছে না।
এরই মধ্যে মক্কার অনেক মানুষ এমন ন্যক্কারজনক নির্বাসনের বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেছিল। যখন তারা চুক্তিপত্রের নাজেহাল অবস্থার কথা শুনল, তখন সমবেত হয়ে আওয়াজ তুলল নির্বাসন তুলে নেওয়ার। অগত্যা নবুওয়াতের দশম বছর আবু তালিব গিরিপথ থেকে রাসুল ও তাঁর সাহাবিরা তিন বছরের দীর্ঘ নির্বাসন শেষে মক্কার যাঁর যাঁর ঘরে ফিরে আসার সুযোগ পেলেন।
নির্বাসন থেকে ফেরার কয়েক দিন পরই অত্যন্ত বেদনাদায়ক একটি ঘটনা ঘটল। রাসুল মুহাম্মদের জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল, তাঁকে কুরাইশদের তলোয়ার আর পাথরবৃষ্টি থেকে আড়াল দেওয়ার অভয়াশ্রয়, তাঁর পালক পিতা পিতৃব্য আৰু তালিব অসুস্থাবস্থায় শয্যাশায়ী হয়ে মারা গেলেন।
গিরিপথের নির্বাসনে আবু তালিবও ছিলেন। এমনিতেই বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, বয়স নব্বইয়ের কাছাকাছি। দীর্ঘ নির্বাসনের ধকল তাঁর শরীর
কুলিয়ে উঠতে পারেনি। রোগে-শোকে একদম শীর্ণ হয়ে পড়েছিলেন। নির্বাসন শেষ করে ঘরে ফেরার পরও তিনি আর সুস্থ হয়ে ওঠেননি। প্রিয়তম ভাতিজার কোলে মাথা রেখে নবুওয়াতের দশম বছরের ৭ রমজান পরলোকগমন করলেন। প্রিয় চাচা আবু তালিবের তিরোধানে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম দিশেহারা হয়ে পড়লেন। তিনি কেবল তাঁর চাচাই ছিলেন না, সেই ছোট্টবেলা থেকে তিনি তাঁকে ছেলের মতো করে বড় করেছেন। কোনো কোনো বিষয়ে তিনি মুহাম্মদকে তাঁর ছেলেদের চাইতেও অগ্রাধিকার দিতেন। বড় ভালোবাসতেন তিনি মুহাম্মদকে। নবুওয়াতের পরও তিনি কখনো তাঁর কাজে সামান্য বিরোধিতা করেননি, বরং তাঁর কাজ যেন নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে পারে, এ জন্য বিরুদ্ধবাদী কুরাইশদের সামনে রক্ষাপ্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে যেতেন। কুরাইশরা যে যা-ই বলুক, তিনি ভালো করেই জানতেন তাঁর ভাতিজার মতো ভালো মানুষ এ আরব কেন, সারা দুনিয়ায় আর একটা খুঁজে পাওয়া যাবে না।
মুহাম্মদ ছিলেন তাঁর গর্বের ধন। সেই চাচা আবু তালিব মুহাম্মদকে আবার এতিম করে চলে গেলেন সকলের অন্তরালে। নির্বাসনের আনন্দ তাঁর পরিণত হলো বিষাদের অভয়ারণ্যে।
কষ্টের নিষ্পেষণ তাঁকে দলে পিষে একাকার করে দিতে লাগল সঙ্গোপনে। মুহাম্মদ যেন আজ নিঃস্ব হয়ে গেলেন।
এখন রইলেন কেবল খাদিজা। মুহাম্মদের জীবনের শেষ রক্ষাপ্রাচীর। পার্থিব সকল জিঘাংসা থেকে বাঁচার শেষ অভয়াশ্রয়।
নির্বাসন থেকে মুক্তি পেয়ে বাড়ি ফিরে এলেও খাদিজার স্বাস্থ্য দিন দিন। খারাপ হচ্ছিল। তবু মুহাম্মদের সঙ্গে নির্বাসনে কাটানো এ তিনটি বছরের অবর্ণনীয় দুঃখ-যাতনা সহ্য করে খাদিজা নিজের জীবনকে করে তুলেছিলেন।
সৌভাগ্যের পরশমণির মতো। কষ্টের নির্মম জাঁতাকল এ তিনটি বছর নির্মমভাবে তাঁকে পিষে ফেলতে চেয়েছে। কিন্তু তিনি প্রবল প্রাণশক্তিকে সঞ্জীবন করে মুহাম্মদের মাথার ওপর বটবৃক্ষের মত ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সকল ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকে মুহাম্মদকে নিরাপদ রাখতে নিজের ভালোবাসা আর মমতার ডানা ছড়িয়ে তার নিচে তাঁকে আগলে রাখতেন।
অবশেষে মুক্তি এসেছে। নিজের বাড়ি যাওয়ার ছুটি মিলেছে। বাকি জীবনটা তিনি মুহাম্মদকে এভাবেই ছায়া দিয়ে, মায়া দিয়ে ভালোবাসার পরশ
দিয়ে ভরিয়ে রাখতে চান। মুহাম্মদের নবুওয়াতকে বিশ্ববাসীর কাছে উড্ডীন করতে চান সগৌরবে। কিন্তু দীর্ঘ নির্বাসন শুষে নিয়েছিল তাঁর শরীরের শেষ
প্রাণশক্তিটুকু। বাড়ি ফিরে বেশ কয়েক দিন অসুস্থ হয়ে পড়ে রইলেন নিবিড় শয্যায়।
৬২০ খ্রিষ্টাব্দ। নবুওয়াতের দশম বছরের ১০ রমজান। খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার বাড়ি।
দীর্ঘদিন বসবাস না করার ফলে বাড়িটি এখন শ্রীহীন। এখানে-সেখানে মাকড়সার ফুল। দেয়াল থেকে খসে পড়েছে পোড়ামাটির পলেস্তারা। টিমটিমে একটা বাতি জ্বলছে এ সন্ধ্যারাতে।
রাসুল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বসে আছেন প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজার পাশে। খাদিজার শরীরটা শুকিয়ে কেমন এতটুকুন হয়ে গেছে। চোখ দুটো কোটরাগত। সারা মুখে ছড়িয়ে পড়েছে অসংখ্য বলিরেখা। শ্বাস নিতে দারুণ কষ্ট হচ্ছে। প্রতিটি শ্বাস যেন রাসুলের বুকে প্রবল হাতুড়পেটা হয়ে
আঘাত করছে। শিআবে আবু তালিবে মক্কার মুসলমানদের নির্বাসন শেষ হয়েছে এই তো কদিন হলো। রাসুলের চোখের সামনে জ্বলজ্বলে হয়ে আছে দুঃখদিনের প্রতিটি স্মৃতি। কী করে ভুলবেন তিনি সেসব দুঃখময় প্রতিটি প্রহর। অভুক্ত-অর্ধাহারী হয়ে কাটাতে হয়েছে কত দিন।
এখন নির্বাসন থেকে মানবিক মুক্তি মিলেছে ঠিকই, কিন্তু রাসুলের হৃদয়ের মুক্তি যেন তমসায় হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। তিন দিন আগে পরলোকগমন করেছেন প্রিয় চাচা আবু তালিব। রাসুলের সবচেয়ে বিশ্বস্তজন, সবচেয়ে অভয়দাতা। ব্যথায় মুষড়ে পড়েছিলেন তিনি। অব্যক্ত কান্নায় হু হু করে ভেঙেছে হৃদয়ের ভালোবাসার প্রতিটি মর্মরসৌধ। মক্কার প্রতিটি পাথর আর ধূলিকণা সাক্ষী আছে সে বেদনার। প্রতিটি সৃষ্টি স্তব্ধ হয়েছিল বেদনার অলৌকিক নোনাজলে।
হায়! আজ প্রিয়তমা খাদিজাও মৃত্যুশয্যায়!
মাঝরাত। পরম কাঙ্ক্ষিত প্রেম মুহাম্মদের কোলে মাথা রেখে তাঁর ২৫ বছরের একান্ত সহধর্মিণী খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা নিভৃতে চলে গেলেন আল্লাহর কাছে। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বোবাকান্নায় আছড়ে পড়লেন প্রিয়তমার শয্যাপাশে।
কোথাও কেউ নেই। চারদিকে কী নিস্তব্ধ আজ মক্কার নিকষ আঁধার রাত্রি। হায় বেদনা। হায় যাতনা। হায়, অশ্রুর বিয়াবানে বুঝি সমাধি হলো এ ভালোবাসার যুগলবেদনার!
এই সেই খাদিজা-যিনি মক্কার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্যক্তি বলে মুহাম্মদকে স্বীকৃতি দিয়ে নিজের সর্বস্ব সঁপে দিয়েছিলেন তাঁর চরণতলে।
এই সেই খাদিজা-হেরার গুহায় ধ্বনিত ইকরা যখন ভীতবিহ্বল করেছিল ধ্যানমগ্ন মুহাম্মদকে দৌড়াতে দৌড়াতে মুহাম্মদ আড়াই মাইল পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছেছিলেন যাঁর ঘরে, তিনি এই অতল প্রেমময়ী খাদিজা। এই খাদিজার কাছে এসেই সদ্য নবি হওয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম নির্ভাবনায় বলেছিলেন, 'আমাকে চাদরাবৃত করে দাও, চাদরাবৃত করো আমার পুরো সত্ত্বা!" খাদিজা বুক দিয়ে আগলে ধরেছিলেন নবুওয়াতের আলোকবিভায় সদ্যস্নাত নবিদ্যুল মুরসালিনকে। তাঁর বুক থেকেই তো আলো পেয়েছিল নুরে মুহাম্মদ! এই সেই খাদিজা মক্কার মুশরিকদের আঘাত, গালি আর গলাধাক্কা খেয়ে মুহাম্মদ যখন আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে ঘরে ফিরতেন, তিনি বুকভরা মমতায় সারা রাত্রি জেগে মুহাম্মদের শরীর থেকে তুলার মতো তুলে নিতেন সমস্ত অবসাদ, যাবতীয় দুঃখ-ক্লেশ, ব্যথার দান। পরদিন মুহাম্মদ দীনের পয়গাম হাতে পথে নামতেন নতুন এক রাসুল হয়ে, নতুন এক পয়গাম্বর হয়ে।
এই সেই খাদিজা-মক্কার অন্যতম বিত্তশালী বলে যাঁর খ্যাতি ছিল, নিজের প্রিয়তম স্বামী নবি মুহাম্মদের জন্য সমস্ত বিত্ত-বৈভব তুচ্ছ করে, সকল পিছুটান ছিন্ন করে নিঃস্ব-রিক্ত হাতে গিরিপথে বরণ করেছিলেন দীর্ঘ বন্দীনিবাস।
আজ সেই খাদিজা তাঁকে ছেড়ে চলে গেলেন। তাঁকে হাহাকারের অবইয়ে ভাসিয়ে গেলেন । হায় আল্লাহ! তোমার দেওয়া এই শ্রেষ্ঠ উপহারের ওপর আমি খুশি, তুমিও তার ওপর খুশি হয়ে যাও!
শেষ পর্ব পড়ুন : 👉 এইখানে ক্লিক করুন

No comments