উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রদিয়াল্লাহু আনহা এর জীবনী ১৫তম পর্ব | Mother of the believers Khadija (RA)
হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রদিয়াল্লাহু আনহা
নবুওয়াতের প্রথম তিন বছর ইসলামের দাওয়াত প্রকাশ্যে ছিল না। ইসলামের প্রাথমিক ইবাদত-উপাসনা পালন করা হতো গোপনে গোপনে। রাসুল মুহাম্মদ তাঁর একান্ত পরিচিত ও বিশ্বস্ত লোকজনের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতেন। কেউ কেউ তাঁর নতুন ধর্মে বিশ্বাস স্থাপন করে তাঁকে নবি হিসেবে মেনে নিত, আবার অনেকে তাঁকে গালমন্দ করে তাড়িয়ে দিত। তখনো মক্কার কুরাইশরা রাসুল ও তাঁর নবুওয়াতের ব্যাপারে বিরোধিতা শুরু করেনি।
সমস্যা তখনই শুরু হলো, যখন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশপ্রাপ্ত হয়ে প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া শুরু করলেন। প্রথম দিকে মুহাম্মদ কুরাইশদের সমবেত করে তাঁর নতুন ধর্মের সত্য বার্তা সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। প্রথম ধাপে তারা এর বিরোধিতা করল। এরপর তিনি সাফা পাহাড়ে আরোহণ করে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইসলামের দিকে আহ্বান করলেন। হজের মৌসুমে বিভিন্ন গোত্রের মানুষকে সম্বোধন করে ইসলামের বাণী প্রচার করলেন। নানাভাবে তিনি আল্লাহপ্রেরিত ধর্মের ব্যাপারে মানুষকে আহ্বান করতে লাগলেন এবং তাঁর এ আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতেই মক্কার কুরাইশদের মাঝে তাঁর এক বিরাট শত্রুদল তৈরি হয়ে গেল।
রাসুলের সঙ্গে কুরাইশদের শত্রুতার মূল কারণ ছিল দুটো। একটি ধর্মীয়, অপরটি ব্যবসায়িক। ধর্মীয় কারণ তো স্বাভাবিক দৃষ্টিতেই বিবেচ্য পূর্বপুরুষদের ধর্মীয় গোঁড়ামি, মূর্তিপূজার প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা, বহুশ্বরবাদী ধর্মের নামে ধর্মীয় সুবিধাবাদিতার প্রতি আকর্ষণ। এসব ছিল প্রধান ধর্মীয় কারণ। ব্যবসায়িক কারণের অন্যতম ছিল হজ মৌসুমের উপার্জনকেন্দ্রিক বিষয়। মূলত এর সঙ্গেও
তাদের ধর্মীয় দেবতাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
হজ মৌসুমে যখন আরবসহ আশপাশের দেশ থেকে তীর্থকামীরা কাবাঘর তাওয়াফ করতে আসত, তখন কুরাইশ গোত্রের নেতারা এসব তীর্থযাত্রীর কাছ থেকে নানা রকম চাঁদা ও খাজনা আদায় করত। এ ছাড়া হজের মৌসুমে কাবাকে কেন্দ্র করে মক্কায় বিরাট মেলা ও বাজার বসত। এসব বাজারের একচ্ছত্র অধিকার ছিল কুরাইশদের হাতে। তারা আগত আরবীয়, পারসিক, সিরিয়ান, মিসরি, ব্যবিলনীয়, ভারতীয় মৌসুমি ব্যবসায়ীদের থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করত। অনেক কুরাইশনেতার নিজেদেরও ব্যবসা ছিল, তারা বিপুল হারে পণ্য বিক্রি করত এ মৌসুমে। এ ছাড়া কাবাঘরে স্থাপিত বিভিন্ন দেব-দেবীর জন্য ভক্ত-উপাসকেরা যেসব অর্ঘ্য ও নজরানা পেশ করত, তা-ও উদরস্থ হতো কাবার কথিত রক্ষক কুরাইশনেতাদের হাত দিয়ে।
কিন্তু মুহাম্মদ যখন নতুন এক ধর্মের কথা বললেন, যে ধর্মে কোনো দেবতা নেই, বহু ঈশ্বর নেই, বলি বা অর্থ দেওয়ার অনুশাসন নেই তখন তাদের স্ফীত উদরে টান পড়াটাই ছিল স্বাভাবিক। কুরাইশনেতারা যে খুব বেশি দেবতাভক্ত ছিল, ব্যাপারটি এমন নয়। প্রথমত ব্যবসায়িকভাবে নিজেদের উদরপূর্তিতে বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা, দ্বিতীয়ত ধর্মীয় গোঁড়ামির জাত্যাভিমান।
এসব কারণে কিছুদিনের মধ্যে মুহাম্মদ মক্কার লোকদের চক্ষুশূলে পরিণত হলেন। শুধু তিনিই নন, তাঁর নতুন ধর্মের দীক্ষা নিয়ে যাঁরা নিজেদের আলোকিত মানুষ হিসেবে বিভাসিত করার প্রত্যয় নিয়েছিলেন, তাঁরাও শিকার হলেন নানা রকম নিপীড়ন ও নির্যাতনের। বাদ গেলেন না মুহাম্মদের পরিবারের সদস্যরাও। তাঁদের ওপরও নেমে আসতে লাগল বিভিন্ন প্রকার অপমান ও লাঞ্ছনার সুতীক্ষ্ণ শেল।
খাদিজা এত দিন তাঁর সংসারে এক হাতে সুখের সরোবর সঞ্জীবিত করে রেখেছিলেন, এবার আরেক হাতে তুলে নিলেন কষ্ট ও যাতনার গভীর নদী।
দিন যেতে লাগল আর মক্কার কুরাইশদের নির্যাতন-উৎপীড়ন বাড়তে লাগল। কখনো আৰু বকরকে জুতা দিয়ে পিটিয়ে অজ্ঞান করা হলো, খাব্বাবকে কয়লার আগুনে ছুড়ে মারা হলো, ইয়াসির ও সুমাইয়াকে শহিদ করে দেওয়া হলো, বেলালকে তপ্ত রোদে শুইয়ে রাখা হলো। আরও যাঁরা আছেন, যাঁরা আল্লাহর নামে শপথ করেছিলেন একত্ববাদের, তাঁদের সবাইকে নানাভাবে নানা গঞ্জনা সহ্য করতে হলো। কিন্তু কেউ ইসলাম ভিন্ন পৌত্তলিক ধর্মে ফিরে গেলেন না। সকল নির্যাতন, উৎপীড়ন সহ্য করে সদর্পে ঘোষণা করে যেতে লাগলেন আহাদ আহাদ ধ্বনি।
রাসুল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের বড় তিন মেয়ে তখন বয়োপ্রাপ্ত হয়েছেন জয়নব, রোকাইয়া, উম্মে কুলসুম। তিনজনই বিবাহিতা।
বড় মেয়ে জয়নব ইতিমধ্যেই স্বামীর ঘরে সংসার শুরু করেছেন। তাঁর স্বামী খাদিজার বোন হালা বিনতে খুয়াইলিদের ছেলে আবুল আস ইবনে রবিয়া। ছোট
মেয়ে দুজনের সংসার শুরু না হলেও তাঁদের বাগদান সম্পন্ন হয়ে আছে মুহাম্মদের চাচা আবু লাহাবের দুই ছেলে উতবা ও উত্তায়বার সঙ্গে। আরেকটু বয়স হলে তাঁরাও স্বামীর ঘরে চলে যাবেন।
কিন্তু সময় বদলে গেছে। যে মুহাম্মদকে আল-আমিন জেনে তাঁর সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক করতে উৎসুক ছিল মক্কার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা, তারা এখন মুহাম্মদের ধ্বংস সাধনে ব্যস্ত। মুহাম্মদের সঙ্গে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করতে একজন আরেকজনের চেয়ে অগ্রগামী।
এরই মধ্যে কুরাইশনেতারা সিদ্ধান্ত নিল, মুহাম্মদ তাঁর মেয়েদের যাদের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন তাদের সকলকে তালাক দিতে বলবে। দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলো। আবু লাহাব তার দুই ছেলের জন্য নির্বাচিত কনে রোকাইয়া ও উম্মে কুলসুমের সঙ্গে তার ছেলেদের বিয়ে ভেঙে দিল। কুরাইশনেতারা একই দাবি নিয়ে গেল আবুল আস ইবনে রবিয়ার কাছেও। কিন্তু আবুল আস নেতাদের সরাসরি জানিয়ে দিলেন, আমি কিছুতেই আমার স্ত্রীকে তালাক দেব না আমি আমার স্ত্রীকে ভালোবাসি এবং আমার সংসারে শান্তির অভাব নেই। বাইরের কারও কথায় আমি আমার সংসারের শান্তি বিনষ্ট হতে দিতে পারি না।
দুই মেয়ের বিয়ে ভেঙে যাওয়ায় খাদিজা কষ্ট পেলেন। আল্লাহর রাসুলও মনোবেদনায় কুঁকড়ে যান। রাসুলের মনোকষ্ট দূর করতে এগিয়ে এলেন মক্কার বিশিষ্ট ধনী ব্যক্তি এবং সদ্য মুসলিম হওয়া উসমান ইবনে আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি রাসুলের মেয়ে রোকাইয়াকে সসম্মানে বিয়ে করলেন। কিছুদিন পর মক্কার কাফেররা নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিলে রাসুলের কন্যার নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি তাঁকে নিয়ে সর্বপ্রথম মক্কা থেকে হিজরত করে ইথিওপিয়া চলে যান।
মুহাম্মদের ওপরও চলতে লাগল নানা অকথ্য নির্যাতন। কখনো তাঁর পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখা হতো, তাঁর দিকে ছুড়ে মারা হতো পাথর, নামাজরত অবস্থায় পিঠের ওপর তুলে দেওয়া হতো উটের গলিত নাড়ি-ভুঁড়ি রাস্তায় হাঁটার সময় দুষ্ট ছেলেদের খেপিয়ে দেওয়া হতো তাঁর পেছনে, পথিমধ্যে তাঁকে পেলে অকথ্য অপমান করা হতো। নির্যাতনের এমন কোনো পদ্ধতি নেই যা তাঁর ওপর প্রয়োগ করা হয়নি। শারীরিক, মানসিক, সামাজিক সকল প্রকারে তাঁকে হেনস্থা করার চেষ্টা করা হতে লাগল। এমনকি তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্রও শুরু করল পাষণ্ড কুরাইশ পৌত্তলিকরা।
এত সব অত্যাচার সয়ে যখন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ঘরে ফিরতেন, তখন খাদিজা পরম মমতায় তাঁকে জড়িয়ে ধরতেন। তাঁকে সান্ত্বনা
দিতেন, কান্না এলে অশ্রু মুছে দিতেন। প্রেরণা দিতেন নতুন দিনের, আল্লাহর পথে আবার অবিচল হয়ে চলার। সব যাতনা একদিন শেষ হয়ে যাবে, আরবের
মানুষ ঠিকই একদিন আল্লাহর মনোনীত ধর্মে বিশ্বাস স্থাপন করবে-এমন প্রবোধ দিয়ে তাঁর অন্তরকে আরও পোক্ত করতেন। সকালে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বেরিয়ে যেতেন। মক্কার অলিগলিতে ঘুরে মানুষকে সত্য ধর্মের প্রতি আহ্বান করতেন। তাদের মূর্তিপূজা থেকে বিরত হয়ে এক আল্লাহর উপাসনায় ব্রতী হওয়ার দাওয়াত দিতেন। কেউ কেউ তাঁর কথা শুনত, কেউ কেউ শুনত না। কেউ আবার তাঁর কথা শুনেই তেড়েফুঁড়ে আসত। আক্রমণ করত তাঁকে অপমান করত লোকসম্মুখে, ভৎসনা করে তাড়িয়ে দিত। মুহাম্মদ সন্ধেবেলা রিক্ত বদনে ঘরে ফিরতেন। মুহাম্মদের যাতনাবিদ্ধ মুখটা দেখে খাদিজার হৃদয় বেদনায় হু হু করে উঠত। যাঁকে তিনি বছরের পর বছর বুকে আগলে রেখেছেন, যাঁর নবুওয়াতকে সুরক্ষিত করতে একটা ফুলের আঘাতও লাগতে দেননি, সেই মুহাম্মদ আজ মানুষের নির্ণয় ঘাত-আঘাতে জর্জর হয়ে ঘরে ফিরে আসেন, ক্লিষ্ট মুখে কাটান সারাটা দিন। এমন দৃশ্য খাদিজার সহ্য হয় না। সন্ধ্যায় মুহাম্মদকে বেদনাহত মুখ নিয়ে ঘরে ফিরতে দেখলেই তাঁর বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে আসতে চায়। নিজেকে শত প্রবোধ দিয়েও শান্ত করতে পারেন না। সব সময় অস্থির হয়ে থাকতেন মুহাম্মদের জন্য আমি আর কী করতে পারি !
স্বামী মুহাম্মদের ধর্মপ্রসার ও তাঁর অনুসারীদের সাহায্যার্থে খাদিজা নিজের সর্বস্ব অকাতরে বিলিয়ে দিতে লাগলেন। কোনো দীন-দুঃখী সাহাবির বাড়িতে আগুন না জ্বললে খাদিজার ঘর থেকে তাঁর খাবারের বন্দোবস্ত হতো। কেউ হিজরতের ইচ্ছা পোষণ করার পরও দারিদ্র্যের কারণে যেতে না পারলে পথখরচ জুগিয়ে দিতেন খাদিজা। ইসলামের জন্য নিজের ব্যবসায়িক মূলধন খরচ করতে মোটেও দ্বিধা করলেন না তিনি। এ যেন 'সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম'!
১৬তম পর্ব পড়ুন : 👉 এইখানে ক্লিক করুন

No comments