উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রদিয়াল্লাহু আনহা এর জীবনী ১৩তম পর্ব | Mother of the believers Khadija (RA)
হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রদিয়াল্লাহু আনহা
১০ আগস্ট ৬১০ ঈসায়ি মোতাবেক রমজানের ২১ তারিখ।
রমজান মাসে মুহাম্মদ সাধারণত অন্যান্য মাসের তুলনায় একটু বেশি ধ্যানমগ্ন হন। কখনো পুরো মাস তিনি জাবালে নুরের হেরা গুহায় কাটিয়ে দিতেন। এবারও তিনি পুরো মাস হেরাকেন্দ্রে নির্জনবাসের জন্য মাসের শুরুতে প্রস্তুতি নিয়ে এসেছেন। মাঝে খাদিজা এসে বার কয়েক তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে গেছেন। খাবারের প্রয়োজনে ক্রীতদাস এসে খাবার দিয়ে যায়। তিনি পূর্ণ রমজান মাস এখানে অবস্থানের ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ।
রাত্রিবেলা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ কোনো আলোর ঝলকানিতে তিনি জেগে উঠলেন। জেগে দেখলেন, আল্লাহর প্রেরিত ফেরেশতা জিবরাইল তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর হাতে একখণ্ড রেশমের টুকরো, তাতে আরবিতে কিছু লেখা আছে। জিবরাইল বললেন, 'পড়ুন'! সদ্য ঘুম থেকে জেগে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম হতবিহ্বল অবস্থায় ছিলেন। চোখের সামনে চমকিত জিবরাইলকে দেখে তিনি কী করবেন বুঝতে পারছিলেন না। ভয় পাওয়া তাঁর হৃদয় থেকে আপনাআপনিই বেরিয়ে এল, 'আমি তো পড়তে জানি না।'
জিবরাইল এগিয়ে এসে মুহাম্মদকে নিজের বুকের সঙ্গে চেপে ধরলেন। মুহাম্মদের মনে হতে লাগল, তাঁর বুকের হাড়গোড় না ভেঙে যায়। তাঁকে ছেড়ে দিয়ে জিবরাইল আবার বললেন, 'পড়ুন'। বিহ্বল মুহাম্মদ আগের মতোই বললেন, 'আমি তো পড়তে জানি না। জিবরাইল আবার তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। ছেড়ে দিয়ে আবার পড়তে বললেন। তিনি একই উত্তর দিলেন। এবার জিবরাইল তাঁকে আরও দীর্ঘক্ষণ বুকের সঙ্গে ধরে রাখলেন। মুহাম্মদের নিশ্বাস বন্ধ হওয়ার জোগাড় হলো। একসময় জিবরাইল তাঁকে ছেড়ে দিয়ে নিজেই আবৃত্তি করলেন 'পড়ো তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি
করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পড়ো এবং তোমার প্রভু নিয়ত দয়াপরবশ। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষাদান করেন। তিনি মানুষকে
শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না।'এবার মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম পড়তে পারলেন। তিনি জিবরাইলের উচ্চারিত বাণীগুলো পুনরাবৃত্তি করলেন। মনে হচ্ছিল, এ বাণীগুলোর প্রতিটি শব্দ অক্ষর তাঁর অন্তঃকরণে খোদাই করে দেওয়া হচ্ছে। তিনি তা বারবার আওড়াতে লাগলেন।
মুহাম্মদ কি জানতেন, এই এক 'ইকরা' শব্দ বদলে দেবে আগামী পৃথিবীর মানচিত্র? বদলে দেবে মানবজাতির প্রলয়ংকরী গতিপথ বদলে দেবে কোটি মানুষের বিশ্বাস, ধর্ম, ভালোবাসা, যুদ্ধ এবং সকল জীবনাচার। এই 'ইকরা' ধ্বনির মাধ্যমে পৃথিবীর বুকে সূচিত হলো নতুন এক পৃথিবীর, নতুন এক সভ্যতার। যে সভ্যতা কেয়ামত পর্যন্ত আলোকিত করে রাখবে এ ধূলোর ধরণি।
আয়াতগুলো মুহাম্মদকে শিখিয়ে জিবরাইল গুহার বাইরে চলে গেলেন। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম সাধনাকেন্দ্রের ভেতরে বসে থরথর করে কাঁপছিলেন। মনে হচ্ছে, পুরো পৃথিবীর ভর তাঁর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। গুহার ভেতর তিনি বেশিক্ষণ থাকতে পারলেন না, অসংলগ্ন পায়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। এখনই তাঁকে খাদিজার অভয়াশ্রয়ে যেতে হবে।
কম্পিত শরীর এবং অসংলগ্ন পায়ে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম যখন পর্বতচূড়া থেকে নিচে নেমে আসছেন, তখন ইথার থেকে আবারও জিবরাইলের কন্ঠস্বর শুনতে পেলেন। জিবরাইলের কণ্ঠ শোনার সঙ্গে সঙ্গে তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, জিবরাইল তাঁর দুই ডানায় ভর করে শূন্যে ভেসে আছেন। তাঁর দিকে তাকিয়ে বলছেন, 'হে মুহাম্মদ। আপনি আল্লাহর রাসুল এবং আমি আল্লাহর প্রেরিত ফেরেশতা জিবরাইল।'
সদ্যসমাপ্ত ওহির ভারে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম তখন এমনিতেই ন্যুব্জ, নতুন করে তিনি আর জিবরাইলের সম্মুখীন হতে চাচ্ছিলেন না। তিনি অন্যদিকে ফিরে তাকালেন। কিন্তু আকাশের যেদিকে তাকান সেদিকেই একই মূর্তিতে জিবরাইলের ডানাবিশিষ্ট কায়া দেখতে পেলেন। জিবরাইল বারবার উচ্চারণ করছিলেন, 'হে মুহাম্মদ! আপনি আল্লাহর রাসুল এবং আমি আল্লাহর প্রেরিত ফেরেশতা জিবরাইল।
এ সময় মুহাম্মদ দেখতে পেলেন, তাকে খোঁজার জন্য খাদিজা লোক পাঠিয়েছেন। তারা গুহায় মুহাম্মদকে না পেয়ে আবার ফিরে গেল। পর্বত মাঝে দাঁড়ানো মুহাম্মদ কিংবা আকাশে উড্ডীন জিবরাইলকে তারা দেখতে পেল না। এ দৃশ্য তাঁকে আরও বিস্মিত করল। মুহাম্মদের বুকে নবুওয়াতের সিলমোহর এঁটে দিয়ে একসময় জিবরাইল ঊর্ধ্বাকাশে লীন হয়ে গেলেন।
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এতক্ষণ স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। জিবরাইল চলে যেতেই তিনি যেন সংবিৎ ফিরে পেলেন। আবার তাঁর শরীরে কাঁপুনি দেখা দিল। নিজের পা স্থির রাখতে পারছেন না। কোনো রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে মক্কার পথ ধরলেন। পথ দিয়ে চলার সময় তিনি শুনতে পেলেন প্রতিটি গাছ, পাতা, তরু-লতা, পাথরসহ সমগ্র সৃষ্টি তাঁর নাম ধরে সম্ভাষণ জানাচ্ছে নবুওয়াতের 'ইয়া রাসুলাল্লাহ, সালাম আলায়কা-
হে আল্লাহর রাসুল, আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক!' সৃষ্টির এ সম্ভাষণ মুহাম্মদকে আরও ভীত করে তুলল। তিনি তাঁর হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলেন। দ্রুত দৌড়ে চলে এলেন খাদিজার কাছে। মুহাম্মদকে এভাবে সম্বন্ধ হয়ে ঘরে ফিরতে দেখেই খাদিজা এগিয়ে গেলেন তাঁর কাছে। জিজ্ঞেস করলেন, আবুল কাসিম। কোথায় ছিলেন আপনি? আপনাকে খোঁজার জন্য আমি লোক পাঠিয়েছিলাম, তারা আপনাকে খুঁজে পায়নি। কী হয়েছে আপনার? আপনাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?”
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাঁর কথার কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। তিনি কথা বলার মতো অবস্থায় ছিলেন না তখন। তাঁর শরীর তখনো কাঁপছে, কাঁপুনি দিয়ে জ্বর চলে এসেছে। নিজেকে কোনো রকম বিছানায় তুলে দিয়ে খাদিজাকে বললেন, 'আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও চাদর দিয়ে ঢেকে দাও।
খাদিজা দ্রুত তাঁকে চাদর দিয়ে ঢেকে দিলেন। মমতার পরশে জড়িয়ে ধরলেন নিজের মাঝে। তাঁকে সান্ত্বনার বাণী শোনাতে লাগলেন, সাহস দিতে লাগলেন বারবার। খাদিজার অভয়বাণী শোনার কিছুক্ষণ পর মুহাম্মদ কিছুটা সুস্থির হলেন। ভয়ার্ত গলায় খাদিজাকে বললেন, 'আমি আমার জীবনের
আশঙ্কায় ভীত। ভায়ংকর কিছু ঘটে গেছে আমার জীবনে।
না, খাদিজা তা বিশ্বাস করেন না। একবারের জন্যও খাদিজা মনে করেন না তাঁর স্বামীর জন্য ভয়ানক কিছু অপেক্ষা করছে। মক্কার সবচেয়ে ভালো মানুষটির জীবনে এমন কিছু ঘটা সম্ভব নয় যার কারণে তিনি জীবননাশের আশঙ্কা করবেন। তিনি মুহাম্মনকে আরও নিবিড়ভাবে আঁকড়ে ধরলেন।
পৃথিবীতে এই বাহুডোর মুহাম্মদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ অভয়াশ্রয়। এই ভালোবাসার দুটো হাত মুহাম্মদের সাহস আর শক্তিমত্তার প্রতীক। তাঁর জন্য
খাদিজার হৃদয়ের অস্থিরতা তাঁর প্রেমের অনন্ত সরোবর। এ কারণে খাদিজা কেবল তাঁর স্ত্রী নন, তাঁর সবচেয়ে কাছের বন্ধু। তাঁর জীবনের সবচেয়ে নিকট
মানবী মুহাম্মদ খাদিজার বুকে মাথা রেখে সুস্থির হলেন। মুহাম্মদ বললেন। মুহাম্মদের মুখ থেকে পৃথিবীর প্রথম মানুষ হিসেবে খাদিজা শুনলেন নবুওয়াতের মহাসত্য পয়গাম। পৃথিবীর প্রথম মুসলিম হওয়ার গৌরব অর্জন করলেন তিনি।
মুহাম্মদ ভীত ছিলেন এমন অকস্মাৎ দৈবদর্শনে। কিন্তু খাদিজা ভয় পেলেন না। খাদিজা ভয় পাবেন কেন? এই দিনটির জন্যই তো তিনি বছরের পর বছর অপেক্ষা করে আছেন। এই মহত্তম মুহূর্তটির জন্যই তো তিনি নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছেন মুহাম্মদের চরণতলে। তাঁর হৃদয়ে এক বিন্দু শঙ্কা নেই, লি পরিমাণ দ্বিধা নেই। শুধু পৃথিবীবাসী কেন, তিনি জিবরাইলের আগমনের আগেও বিশ্বাসী মুহাম্মদের নবুওয়াতের ওপর। তিনি ইসলাম আগমনের পূর্ব থেকেই মুহাম্মদি ধর্মে বিশ্বাসী। মুহাম্মদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা তাঁকে যেন ইসলাম আগমনের আগেই মুসলিম বানিয়ে দিয়েছিল তাঁর ভালোবাসায় তাঁর বিশ্বাসে। তাঁর জন্মই হয়েছে এই নবুওয়াতে মুহাম্মদের জন্য মুহাম্মদকে এভাবে বুকে আগলে রাখার জন্য, পৃথিবীর সকল জিঘাংসা থেকে মুহাম্মদের আত্মাকে স্বচ্ছ, পবিত্র রাখার জন্য।
উজ্জ্বল মুমিনিন খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রাদিয়াল্লাহু আনহা। মুহাম্মদকে নবিরূপে প্রত্যয়ন করতে যে দৃঢ়তা এবং সাহস দেখিয়েছেন, তা এককথায়: অনন্য। স্বামীর এমন সঙ্গিন মুহূর্তে যেকোনো স্ত্রী ভয়ে ভীত হয়ে পড়ত। কিন্তু তিনি কেবল ঘটনার সম্মুখই করলেন না, মুহাম্মদের নবুওয়াতের সত্যতার প্রথম প্রভায়ন করলেন
"আপনি মোটেও ভয় পাবেন না। আল্লাহর কসম! তিনি কখনোই আপনাকে অপদস্থ করবেন না। আপনি আত্মীয়দের সঙ্গে সদাচরণ করেন, দুস্থদের বোঝা বহন করেন, নিঃস্বদের কর্মসংস্থান করেন, অতিথিদের আপ্যায়ন করেন এবং বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করেন। হে মুহাম্মদ। অবিচল থাকুন। যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ করে বলছি-আপনি এ যুগের মানবজাতির জন্য নবি হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। এ আমার বিশ্বাস, আমার স্বীকারোক্তি।' মুহাম্মদ এখনো অপ্রকৃতিস্থ। কিন্তু খাদিজা দেরি করলেন না, মুহাম্মদকে ঘরে শুইয়ে রেখে তখনই বেরিয়ে পড়লেন। চলে এলেন চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের বাড়িতে। ওয়ারাকার কাছে গিয়ে খাদিজা নিশ্চিত হতে চাচ্ছিলেন এবং ঘটে যাওয়া ঘটনার সত্যনিষ্ঠতার ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হতে চাচ্ছিলেন। বস্তুত তিনি জানতে চাচ্ছিলেন, নবুওয়াতের প্রত্যাদেশ কি এভাবেই ঘোষিত হয় মানবমনে? মুহাম্মদ নবি হবেন বা হয়েছেন -এর সত্যায়ন প্রয়োজন ছিল না তাঁর, তাঁর প্রয়োজন ছিল নবুওয়াত কি সত্যিই প্রত্যাগমন করেছে?
খাদিজা হন্তদন্ত হয়ে ওয়ারাকার কাছে গিয়ে বললেন যা তিনি সদ্য শুনেছেন মুহাম্মদের মুখ থেকে। ওয়ারাকা খাদিজার মুখ থেকে এমন সংবাদ শোনার জন্য বহুদিন থেকে অপেক্ষা করছিলেন। নিজের কানে নবুওয়াতের আগমনী সংবাদ শোনা-এ ছিল তাঁর কাছে এক পরম সৌভাগ্যের বিষয়। ওয়ারাকা মুহাম্মদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা শুনে চিৎকার করে উঠলেন, 'শপথ সেই সত্তার, যাঁর হাতে ওয়ারাকার প্রাণ! তুমি যা বলছ তা যদি সত্য হয়ে থাকে হে খাদিজা, তাঁর কাছে যে অলৌকিক ব্যক্তি এসেছিলেন, তিনি তো আল্লাহর ফেরেশতা 'নামুস' (প্রাচীন আরবে ওহি অবতীর্ণের ফেরেশতাকে নামুস বলা হতো)। যিনি পূর্ববর্তী নবি মুসা এবং ঈসার কাছেও আল্লাহর প্রত্যাদেশ নিয়ে এসেছিলেন। তুমি শুনে রাখো নিঃসন্দেহে মুহাম্মদ এ যুগের নবি। তাঁকে গিয়ে জলদি জানাও এ কথা। তাঁর নবুওয়াতের সত্যায়ন করো। আর তাঁকে অবিচল
থাকতে বলো, ভেঙে পড়তে দিয়ো না।' খাদিজা বাড়ি ফিরে এলেন। মুহাম্মদকে বুকে আগলে ধরে পার করলেন নবুওয়াতের প্রথম রাত্রি।
পরদিন সকাল হতেই খাদিজা মুহাম্মদকে নিয়ে আবার এলেন ওয়ারাকার বাড়িতে। দৃষ্টিহীন ওয়ারাকার সামনে মুহাম্মদকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, 'ভাইজান, এবার আপনার ভাতিজার মুখ থেকেই শুনুন সে কী বলে।"
বৃদ্ধ ওয়ারাকা এগিয়ে এসে সসম্মানে মুহাম্মদের কপালে চুমু খেলেন। তারপর তাঁর কাছে গত রাতে ঘটে যাওয়া ঘটনার আদ্যোপান্ত শুনতে চাইলেন। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলে গেলেন যা কিছু তিনি শুনেছেন, या তিনি দেখেছেন দৈবদর্শন, যা কিছু অনুধাবন করেছেন নিজের অন্তঃকরণ দিয়ে। ওয়ারাকা শুনছিলেন আর তাঁর চেহারার অভিব্যক্তি বদলে যাচ্ছিল মুহূর্তে মুহূর্তে। বছরের পর বছর ধরে যে ঘটনার জন্য তিনি প্রতীক্ষমাণ, যে নবির দর্শনে তিনি অপেক্ষা করে আছেন, যে নবুওয়াতের সুসংবাদ শোনার জন্য তিনি অধ্যয়ন করেছেন নিবিষ্টচিত্তে আজ সে নবি ও নবুওয়াত তাঁর সামনে উপবিষ্ট। ওয়ারাকার চোখজুড়ে কৃতজ্ঞতার অশ্রু টলমল করছে। এক জীবনে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি তাঁর কাছে আর কিছুই নয়। তাঁর মানবজন্ম আজ সার্থক হলো।
ওয়ারাকা ইবনে নওফেল মুহাম্মদের জীবনে প্রত্যাগত নবুওয়াতের সত্যায়ন করলেন। তিনি মুহাম্মদকে আল্লাহর নবি হিসেবে পৃথিবীর বুকে সর্বপ্রথম স্বীকৃতিই শুধু দিলেন না, তাঁকে তাঁর অনাগত জীবনের জন্য প্রস্তুত থাকতে বললেন। ওয়ারাকা অভয় দিয়ে বললেন, 'আফসোস! আমি ভয় করছি সেদিনের, যেদিন তোমার দেশবাসী তোমাকে এ দেশ থেকে বের করে দেবে। হায়! যদি আমি সেদিন সুস্থাবস্থায় জীবিত থাকতাম, তবে অবশ্যই সময়ের এমন নির্দয়তা থেকে বাঁচাতে তোমাকে সাহায্য করতাম।' সদ্য নবুওয়াতপ্রাপ্ত হতবিহ্বল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ওয়ারাকার এ কথা শুনে আরও বিচলিত হয়ে পড়লেন, সত্যিই আমার দেশবাসী আমাকে এ দেশ থেকে বের করে দেবে?”
ওয়ারাকা সত্য গোপন রাখতে চাইলেন না। তিনি মুহাম্মদকে দৃঢ়পদ করতে চাচ্ছিলেন। ভবিষ্যতের সকল জিঘাংসা যাতে তিনি সহ্য করার ক্ষমতা অর্জন করেন, তার প্রথম সরক তাঁকে দীক্ষা দিয়ে অভয়চিত্তে বললেন, 'হ্যাঁ, তারা তোমাকে তোমার দেশ থেকে বিতাড়িত করবে। যুগে যুগে যারাই তোমার মতো সত্য ধর্ম নিয়ে আগমন করেছিলেন, সবাইকে তাঁদের স্বজাতি লোকসকল দেশ থেকে বিতাড়িত করেছিল।

No comments