দরিদ্র বাবার দীর্ঘশ্বাস - রাফিয়া তাহসিন চৌধুরী জাগরণ - রকমারী ছোটগল্প
কাঠফাঁটা রোদে তীব্র গরমের মধ্যে চোখ দুটো যেন বন্ধ হয়ে আসছে। রিকশার প্যাডেলে পা দুটো আটকে যাচ্ছে বারবার। তবুও অনেক কষ্টে রিকশা চালিয়ে যাচ্ছে জসীম। মেয়ের জামাই রুই মাছের মুড়ো খেতে চেয়েছে। পকেট হাতিয়ে দেখলো সারা দিনে মাত্র পঞ্চাশ টাকা রোজগার হয়েছে। যেভাবেই হোক আজকে একটা রুই মাছের মুড়ো বাড়ি নিয়ে যেতেই হবে।
কাল রাতে মেয়ে-জামাই দুজনেই বাড়ি এসেছে। মাসের শেষ সপ্তাহ চলছে। কোনোদিনও যে মেয়ের উপর একটু আঁচও আসতে দেয়নি, কাল সে মেয়ের ফোলা কপাল দেখেই জসীম বুঝে ফেললো, জামাই বাবাজির খাতিরদারির সময় এসেছে। অথচ বিয়ের সময় তারা বলেছিলো তারা যৌতুকের ঘোর বিরোধী।
সারাদিনের পরিশ্রমের পর মসজিদে মাগরিবের নামাজ পড়েই সে রওনা হলো মাছের বাজারে। সেখানে জসীম আরো একজনের সাথে ভাগে কিনলো একটা রুই মাছ, অনেক বলে কয়ে মুড়োর দিকটা নেয় সে।
বাড়ি ফিরেই মনোয়ারার হাতে বাজারের ব্যাগ দিয়ে বললো, “ভালো করে রান্দিস বউ, জামাইয়ের পরাণডা যেন ভরে।” রাতে খাবার পাতে সবাই যখন একসাথে বসে খাচ্ছে, ঠিক তখনই জসীম জিজ্ঞাসা করলো, “কী বাবাজি, কেমন হইছে মুড়িঘণ্ট?” জামাইয়ের সোজা উত্তর, “ভালোই, তবে লবণডা আরেকটু হইলে ভালো হইতো।” জসীমের ছেলে জামালের আর তর সইলো না। রাগে গজগজ করতে করতে, লবণের বাটিটা হাতে নিয়েই দুলাভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললো, “দুলাভাই, এই যে লবণ, নেবেন নাকি? ঢেলে দেই?” জামাইয়ের আর বুঝতে বাকি রইলো না। সাথে সাথে বললো, “না না, ঠিকই আছে।” জসীমের চোখ রাঙানিতে দমে গেলো ছেলেটা।
সারাদিন খাটুনির পর রাতে এক ক্লান্তির ঘুম দেয় জসীম। ফজরের নামাজের পর বাড়ির ঈশান কোণের শালগাছতলায় একটা চেয়ার নিয়ে বসে সে। কত স্মৃতি গাছটার সাথে তার, বাপের আমলের গাছ। মুনিয়ার জন্য দোলনাও বেঁধেছিলো এ গাছের নিচু ডালটাতে। গাছটার ছায়ায় বসে কতশত গল্প শুনাতো মেয়েকে। মেয়েরা কত তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যায়, ভাবতে ভাবতে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে তার। ময়লা শার্টের হাতায় চোখ মোছে সে।
সকালের হালকা বাতাস প্রশান্তি এনে দিচ্ছে। ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসতে চায়। প্রতিদিন সকাল হলেই রিকশা নিয়ে বের হতে হয়। আজ আর যেতে ইচ্ছে করছে না। এদিকে মেয়ের থেকে বিশ বছরের বড় জামাইয়ের আবদারের শেষ নেই। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সব সহ্য করে সে। কারণ, সে মেয়ের বাবা! হঠাৎ পায়ের তালুতে ঠান্ডা কিছু অনুভব করে জসীম। চোখ তুলে দেখে মুনিয়া পায়ে মলম লাগিয়ে দিচ্ছে। তার চোখদুটো একদম লাল। বাবার পা দুটো ধরে মেয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে।
মেয়ের চোখে পানি দেখে জসীমের কষ্টে বুক ভাসে। সে বলে, “কান্দিস না মা, আস্তে আস্তে লেপ-তোষক, ফ্রিজ-আলমারি সবই দিমু ইন-শা-আল্লাহ্।” মেয়ের কান্না থামে না। জসীম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, মনে রাখবি মা, নবীজি (স) কইছেন, “আল্লাহ যার ভালো চান তারে দুঃখ কষ্টে ফেলেন।”[১]
আবার সারাদিনের কাজকর্ম সেরে মাগরিবের নামাজের পর বাড়ি ফেরে জসীম। মেয়ে-জামাই কালকে চলে যাবে। আজকেও রোজগার হয়েছে মাত্র তিনশো টাকা। সকালবেলা মেয়েকে এগিয়ে দিতে গিয়ে জামাইয়ের হাতে দু'শো টাকা ধরিয়ে দেয় সে। জামাই হালকা হাই তুলে বলে, “আব্বা, আমার আম্মার না অনেক শখ, শালকাঠের বিছানায় শুয়ে নিজের শেষ জীবনটুকু পার করবেন।” মুখে এক পৈশাচিক হাসি। জসীমের দীর্ঘশ্বাস এবার আর্তনাদে পরিনত হতে চাচ্ছে! কিন্তু সে তার মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে, চোখের পানি ফেলবে না! কারণ সে জানে, “মজলুমের বদদোয়া এবং আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা থাকে না।”[২]
[১] সহিহ বুখারি : ৫৬৪৫
[২] সহিহ বুখারি : ১৪৯৬
দরিদ্র বাবার দীর্ঘশ্বাস
%20(15).jpeg)
No comments