উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রদিয়াল্লাহু আনহা এর জীবনী ১ম পর্ব | Mother of the believers Khadija (RA)
হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রদিয়াল্লাহু আনহা
[১]
আবদুল্লাহ তাঁর পিতা আবদুল মুত্তালিবের পেছনে পেছনে যাচ্ছেন। কিছুক্ষণ আগে মক্কার মানুষ পিতা-পুত্রের ভালোবাসার এক অভূতপূর্ব ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে। এমন ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে সচরাচর ঘটে না। পুরো মক্কা স্তব্ধ হয়ে ছিল কিছু সময়ের জন্য। মক্কার পবিত্র স্থান কাবাঘরের পাশে ঘটছিল এ ঘটনা। কাবাচত্বরে পৌত্তলিকদের স্থাপিত হোবল দেবতার সামনেই।
মক্কার কুরাইশ গোত্রীয় নেতা আবদুল মুত্তালিব একের পর এক জবাই করছিলেন নিজের পালের উট। গুনে গুনে ১০০। কাবার আশপাশটা উটের রক্তে লাল হয়ে গেল। চারপাশে জমায়েত লোকজন আবদুল মুত্তালিবের এমন প্রতিজ্ঞারক্ষার ত্যাগ দেখে অবাক না হয়ে পারল না ১০০ উট কুরবানি করে। দিলেন নির্দ্বিধায়?
না, তবু থামলেন না আবদুল মুত্তালিব। তিনি আরও ৩০টি উট আনলেন। হোবল দেবতার হাতে রাখা ভাগ্যনির্বাচনের তির উত্তোলন করলেন আবার। তিনবারই পুত্র আবদুল্লাহর নাম বাদ দিয়ে উটের নাম নির্বাচিত হলো। প্রতিবার তির উত্তোলনের বিনিময়ে ১০টি করে উট কুরবানি করে দিলেন। একে একে ৩০টি। গুনে গুনে সর্বমোট ১৩০টি। এরপর পুত্র আবদুল্লাহর হাত ধরে তাঁকে নিয়ে সামনে এগিয়ে গেলেন আবদুল মুত্তালিব। কুরাইশ গোত্রের এ অবিসংবাদিত নেতা কিছুদিন আগে এক অভিনব উদ্যোগ গ্রহণ করে পুরো মক্কা তো বটেই, পুরো আরবের সম্মান আদায় করে নিয়েছেন।
স্বপ্নে প্রত্যাদিষ্ট হয়ে তিনি নতুন করে খনন করেন জমজম কূপ। নবি ইসমাইল আলায়হিস সালামের পদাঘাতে প্রায় তিন হাজার বছর আগে যে কূপের ধারা প্রবাহিত হয়েছিল কাবার প্রান্তরে, কালের বিবর্তনে সে কূপ একসময় লুপ্ত হয়ে যায় মরুর বালিয়াড়ির নিচে। স্বপ্নে প্রত্যাদিষ্ট হয়ে তিনি নির্দিষ্ট স্থান খনন করে আবার সে কূপ মানুষের জন্য উন্মোচন করে দেন। জমজম কূপের সুমিষ্ট সুপেয় পানি পেয়ে মক্কার মানুষজন আবদুল মুত্তালিবের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে। এ ঘটনার পর পুরো মক্কা অঞ্চলে তিনি অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে বরিত হন।
[২]
কিন্তু কূপ খননের এ কর্মযজ্ঞ সমাধা করা খুব একটা সহজ ছিল না তাঁর জন্য। কূপ খননকালে নানা বাধার সম্মুখীন হন তিনি। মক্কা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের কয়েকজন গোত্রপতি দাবি করেন যেহেতু কাবাঘরের মালিকানায় তাঁরাও সমান হকদার, সুতরাং এ কূপের মালিকানায় তাঁদেরও অংশীদার করতে হবে। আবদুল মুত্তালিব স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি স্বপ্নাদিষ্ট এ কূপের মালিকানায় কাউকে অংশীদার করবেন না। তিনি নিজে স্বপ্নাদিষ্ট হয়েছেন বিধায় এর মালিকানা এককভাবে তাঁর নিজস্ব।
এ নিয়ে উভয় পক্ষে বিবাদ ঘনিয়ে ওঠে। অবশেষে সিদ্ধান্ত হয় কূপের মালিকানা কারও একক হাতে থাকবে না, কাবা শরিফের নামে উৎসর্গিত হবে এ জমজম। প্রতিবছর উপাসনালাভে ধন্য হতে আসে যে তীর্থযাত্রীরা, তাদের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য অর্পিত হবে এ জলাধার এবং কূপের পানি অবমুক্ত করে দেওয়া হবে সর্বসাধারণের জন্য। এ সিদ্ধান্তে শান্তি ফিরে আসে মক্কায় ।
সব বাধা-বিপত্তি দূরে ঠেলে যখন বালিয়াড়ির নিচ থেকে উৎসারিত হয়। প্রভুর প্রেরিত জমজম অসলিলা, আবদুল মুত্তালিব প্রভুর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রতিজ্ঞা করেন-তাঁর ছেলেরা যখন সবাই পূর্ণবয়স্ক হবেন, তাঁদের একজনকে তিনি জমজমপ্রাপ্তির কৃতজ্ঞতায় আল্লাহর উদ্দেশে কুরবানি করে দেবেন। তাঁর এ প্রতিজ্ঞার কারণ ছিল, আদি পিতা ইবরাহিম আলায়হিস সালাম যেমন তাঁর প্রিয়তম পুত্র ইসমাইলকে আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভের জন্য কুরবানি করে দিয়েছিলেন, তিনিও তাঁর প্রিয় কোনো এক পুত্রকে আল্লাহর জন্য কুরবানি করে দেবেন।
জমজম পুনঃখননের পর কেটে গেছে অনেক বছর। আবদুল মুত্তালিব প্রৌঢ় থেকে বৃদ্ধ হয়েছেন, কিন্তু তিনি তাঁর প্রতিজ্ঞারক্ষার কথা ভুলে যাননি। তাঁর ছেলেরা সবাই যখন পূর্ণবয়স্ক, তখন সেই প্রতিজ্ঞা পূরণ করতে সপ্তাহ কয়েক আগে তিনি সর্বকনিষ্ঠ পুত্র আবদুল্লাহকে কুরবানি দেওয়ার উদ্দেশে হোবল দেবতার সামনে নিয়ে আসেন। কিন্তু তাঁর এ কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ায় অন্য ছেলেরা। তাঁর ১০ ছেলের সবাই তাঁকে নিবৃত্ত করেন এ কাজ থেকে। বিশেষত আবু তালিব, আব্বাস ও হামজা পিতাকে এমন প্রতিজ্ঞা পূরণ করার পরিবর্তে বিকল্প কোনো পদ্ধতি খোঁজার পরামর্শ দেন। নিজেদের চোখের সামনে তাঁরা তাঁদের প্রিয়তম ভাইকে বলি হতে দিতে পারেন না।
[৩]
পুত্রদের বাধার কারণে আবদুল মুত্তালিব মক্কার গুণীজনদের কাছে এ সমস্যার আশু সমাধানে পরামর্শ কামনা করেন। তাঁরা তাঁকে মদিনায় এক নারী গুনিনের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি নক্ষত্রবিচার ও মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে এ সমস্যার একটা সমাধান দিতে পারবেন। অগত্যা তাঁদের কথামতো আবদুল মুত্তালিব পুত্র আবদুল্লাহ এবং গণ্যমান্য লোকদের নিয়ে মদিনায় যান। সেখানে সাজাহ নামের নারী গুনিনের কাছে তাঁর মনোবাঞ্ছা প্রকাশ করেন।
সাজাহ নামের এই নারী জ্যোতিষী পরামর্শ দেন-আবদুল্লাহকে বলি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আবদুল্লাহর পরিবর্তে ১০টি উট নেবে। ১০টি উট এবং আবদুল্লাহর নাম আলাদা আলাদা তিরের মাথায় লিখে তা হোবল দেবতার হাতে স্থাপিত ভাগ্যনির্বাচন পাত্রে রাখতে হবে। সেখান থেকে একটি তির উঠাবে, যদি তিরের মাথায় আবদুল্লাহর নাম উঠে তবে তাঁর পরিবর্তে সেই ১০টি উট কুরবানি করে দিতে হবে এবং আবার আরও ১০টি উট নিয়ে ভাগ্য নির্বাচন করতে হবে। যদি আবার আবদুল্লাহর নাম উঠে তবে আবার অনুরূপ ১০টি উট ও আবদুল্লাহর নাম লিখে ভাগ্যনির্বাচন করতে হবে। আর যদি আবদুল্লাহর নাম না উঠে ১০টি উট থেকে কোনো একটি উটের নাম উঠে, তবে সেই ১০টি উট কুরবানি করে দিলেই প্রতিজ্ঞা পূরণ হয়ে যাবে। আর কোনো উট কুরবানি করার প্রয়োজন নেই।
আবদুল মুত্তালিব মক্কায় এসে তাঁর প্রতিজ্ঞা পূরণে ১০টি উট নিয়ে আবদুল্লাহর ভাগ্যগণনায় নেমে পড়লেন। প্রথমবার আবদুল্লাহর নাম ওঠল। গুনিনের নির্দেশনা অনুযায়ী আবদুল্লাহর পরিবর্তে ১০টি উট কুরবানি দেওয়া হলো। দ্বিতীয়বারও আবদুল্লাহর নাম নির্বাচিত হলো। আবার দশ উট কুরবানি দেওয়া হলো। তৃতীয়বারও আবদুল্লাহর নাম ওঠল। এভাবে দশমবার গিয়ে উটের নাম ওঠল। অর্থাৎ ততক্ষণে ১০০ উট কুরবানি করা হয়ে গেছে।
[৪]
কিন্তু এতে আশ্বস্ত হলো না আবদুল মুত্তালিবের অন্তর। তিনি আরও ৩০টি উট আনলেন এবং আরও তিনবার আবদুল্লাহর ভাগ্যগণনা করলেন। এবার প্রতিবারই আবদুল্লাহর পরিবর্তে উটের নাম নির্বাচিত হলো। এভাবেই আবদুল্লাহর জীবনের বিনিময়ে কুরবানি করা হলো ১৩০টি উট। এ ঘটনার পর আবদুল্লাহর নাম হয়ে গেল 'জবিহুল্লাহ'- আল্লাহর জন্য উৎসর্গিত।
কুরবানির এ ঘটনার কিছুক্ষণ পর যখন আবদুল্লাহকে নিয়ে তাঁর পিতা আবদুল মুত্তালিব কাবা চত্বর থেকে বেরোতে যাবেন, ঠিক তখন এক নারীকে দেখা গেল চত্বরের পাশে। আরবীয় এ নারী যথেষ্ট সুন্দরী। বেশভূষায় অভিজাত। মাথার ওপর সবুজরঙা কাপড়ের ঘোমটা টানা। ঘোমটার নিচে তাঁর ফরসা চেহারা ফুটে আছে মরু নার্গিসের মতো।
এতক্ষণ ধরে তিনি আবদুল্লাহ আর উটের ভাগ্যপরীক্ষার এ জাগযজ্ঞ দেখছিলেন। সবাই উট জবাইয়ের মহাযজ্ঞের দিকে তাকিয়ে থাকলেও তিনি একদৃষ্টিতে দেখছিলেন আবদুল্লাহকে। দেখছিলেন আর নিজের মনের অবয়বের সঙ্গে মিলিয়ে নিচ্ছিলেন সন্তর্পণে। এই কি সেই? এই কি সেই যুবক, যাঁর ব্যাপারে তাঁর ভাই ওয়ারাকা বহুদিন থেকে অপেক্ষা করে আছেন? ওয়ারাকার দেওয়া বর্ণনা হুবহু মিলে যায় এ যুবকের সঙ্গে। সেই বংশধারা হাশেমি। সেই উন্নত চরিত্রের অধিকারী-নিষ্কলুষ।
নাকি এ যুবক প্রতীক্ষিত ব্যক্তির পূর্ববর্তী বংশধারার কেউ? হয়তো বা তা ই হবে। হোক, সে প্রতীক্ষিত ব্যক্তি না হোক, তাঁর পূর্ববর্তী বংশধারার কেউ হলেও তাঁর মনে কোনো দ্বিধা নেই। সেই প্রতীক্ষিত ব্যক্তির মা হতে পারলেও তাঁর সাত জনমের সাধ পূর্ণ হবে। তাঁর গর্ভ থেকে পূর্ণতা পাবে অনাগত পৃথিবী। কুরবানির এ মহাযজ্ঞ শেষ হলো একসময়। কাবাঘরের চারপাশে পড়ে রইল ১৩০টি জবাইকৃত উট। আবদুল মুত্তালিব মক্কাবাসীর জন্য ওয়াক্ফ করে দিলেন সমস্ত উট। যে যেভাবে ইচ্ছা খেতে পারে এ উটের মাংস, কোনো বাধা নেই। আবদুল্লাহকে পিতার পেছনে পেছনে যেতে দেখে আরবীয় নারীটি ডাক দিলেন তাঁর নাম ধরে, আবদুল্লাহ, শুনে যাও! কোথায় যাচ্ছ?” পিতার পেছন থেকে থমকে দাঁড়ালেন আবদুল্লাহ। নারীটির দিকে ফিরে তাকালেন তিনি। এ যে ফাতেমা, উম্মে কিতাল নামেই সবাই চেনে তাঁকে। মক্কার পণ্ডিতব্যক্তি ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের বোন। তিনি তাঁকে এভাবে ডাকছেন কেন? তিনি এগিয়ে এলেন উম্মে কিতালের দিকে।
[৫]
উম্মে কিতাল তাঁর ভাই ওয়ারাকার মতোই গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারী। পুরো আরবে অল্প যে কজন নারী তাওরাত ও ইঞ্জিলে যথেষ্ট ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছেন, তিনি তাঁদের একজন। ভাইয়ের তত্ত্বাবধানে থেকে তিনিও বুঝতে পেরেছিলেন, শেষ নবির আগমন সন্নিকটে এবং সেই নবির আগমন
ঘটবে এই মক্কা বা আশপাশের কোনো আরব ভূমিতে। সেদিন থেকে উম্মে কিতাল অপেক্ষায় আছেন কোনোভাবে যদি সেই ব্যক্তির সান্নিধ্যে নিজের জীবন জড়িয়ে নেওয়া যায়। আজ আবদুল্লাহকে দেখে তাঁর অবয়বের সঙ্গে কোথায় যেন সেই প্রতীক্ষিত নবির অবয়বের মিল খুঁজে পাচ্ছিলেন তিনি। তাই আর দেরি করলেন না, আবদুল্লাহ কাছে আসতেই তাঁকে ডেকে বললেন, 'কোথায় যাচ্ছ, আবদুল্লাহ?" আবদুল্লাহ উম্মে কিতালের কাছে এসে বললেন, 'আমি তো পিতার সঙ্গে যাচ্ছি। তিনি কোথায় যাবেন, কে জানে!
উম্মে কিতাল কোনো ভণিতায় গেলেন না, কোনো ধরনের লুকোছাপার আশ্রয় নিলেন না, সরাসরি প্রস্তাব দিলেন, যদি এ মুহূর্তে তুমি আমাকে বিয়ে করতে সম্মত হও, তবে তোমার পিতা তোমার নামে যতগুলো উট কুরবানি করেছেন, আমি তোমাকে সে পরিমাণ উট উপহার দেব। বলো, তুমি কি রাজি আছো?
উম্মে কিতালের এমন সরাসরি প্রস্তাব শুনে আবদুল্লাহ হকচকিয়ে গেলেন, খানিকটা বিব্রতবোধ করলেন। কী জবাব দেবেন বুঝতে পারলেন না। শুধু বললেন, আমি এখন পিতার সঙ্গে যাচ্ছি। এ ব্যাপারে আমার নিজস্ব কোনো মতামত নেই, পিতা যা বলবেন আমি সেটাই মেনে নেব।' উম্মে কিতাল বিষয়টি আবদুল্লাহকে আরেকবার ভেবে দেখার কথা বললেন। কিন্তু আবদুল্লাহ পিতার অনুমতি ছাড়া কোনো মতামত ব্যক্ত করতে পারবেন না বলে উম্মে কিতালের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজের পথ ধরলেন। পেছন থেকে উম্মে কিতাল তাঁর পথপানে চেয়ে রইলেন। তাঁর মনে হচ্ছে তিনি হিরণয় কিছু একটা হারিয়ে ফেলছেন প্রতি মুহূর্তে, জীবনের এক প্রতীক্ষিত আলোকধারা থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছেন। হেরে যাচ্ছেন অমূল্য এক পার্থিব ও পারলৌকিক বিস্তৃতি থেকে। তিনি অনুধাবন করতে পারছিলেন আজ তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরাজয় ঘটল।
২য় পর্ব পড়ুন : 👉 এখানে ক্লিক করুন

No comments